দূর থেকে তাকালে মনে হবে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। কাছে গেলে বোঝা যায়—এটি আসলে একটি নদী, যার বুক কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। নাম তার রাংসা নদী। একসময় যে নদী ছিল ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার প্রাণ, আজ সেটিই মৃতপ্রায়। উৎপত্তি ও ঐতিহ্যের গৌরব হারিয়ে প্রভাবশালীদের দখল-দূষণে, অবৈধ বাঁধ, মাছের ঘের ও ড্রেজারের দৌরাত্ম্যে রাংসা এখন নিঃশ্বাস নিতে লড়ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাংসার জন্ম বুড়বুড়িয়া বিল থেকে। বিলের অতিরিক্ত পানি ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়ে এটি রূপ নেয় নদীতে। ফুলপুর উপজেলা-এর দক্ষিণাঞ্চল পেরিয়ে নদীটি তারাকান্দা উপজেলা হয়ে গিয়ে মিশেছে ধলাই নদী-তে। পরে পূর্বধলা উপজেলা অতিক্রম করে গিয়ে পড়ে মগড়া নদী-তে। ‘রাংসা’ নামটির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে লোকশ্রুতি। নদীসংলগ্ন এলাকায় একসময় মান্দি (গারো) জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘রাংসা’ তাদের একটি বংশীয় টাইটেল। ধারণা করা হয়, সেই বংশের নাম থেকেই নদীর নামকরণ হয়েছে। দেড়-দুই দশক আগেও রাংসা ছিল নৌ-যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ। বর্ষা মৌসুমে ছোট ট্রলার ও নৌকা চলত নিয়মিত। কৃষিপণ্য, কাঠ, খড়সহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে নদীপথ ছিল সহজ মাধ্যম। নদীর ঘাট ঘিরে গড়ে উঠেছিল হাট-বাজার, বসতি ও সামাজিক জীবন।উপজেলার অধিকাংশ হাট-বাজার এ নদীর তীরে গড়ে উঠেছে।
বর্ষায় নদীর পানি আশপাশের জমির উর্বরতা বাড়াত, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেচের জোগান দিত। দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসেবেও রাংসার খ্যাতি ছিল। শোল, টেংরা, কই, শিংসহ নানা প্রজাতির মাছ ধরা পড়ত এখানে। বর্তমানে নদীর বুক জুড়ে কচুরিপানার ঘন আস্তরণ। কোথাও কোথাও নদীর চিহ্নমাত্র রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বাঁশের বানা দিয়ে বাঁধ দেওয়া হয়েছে, জালের ঘের তৈরি করে মাছ চাষ চলছে। এতে পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া অপরিকল্পিত পুকুর খনন ও খাল-বিল দখলের কারণে নদীর স্বাভাবিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তার ওপর নদীর বুকে বসানো হয় ড্রেজার। যেখানে বালু তোলা হয়, সেখানেই কেবল পানির দেখা মিলে। বাকি অংশ কচুরিপানায় ঢেকে আছে। এতে নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোর মৌসুমে প্রায় ২১ হাজার ৩ শত ২৫ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল করিম বলেন, “আগে এই নদীর পানি দিয়ে আমরা জমিতে সেচ দিতাম। এখন নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ নেই।প্রভাবশালীদের দখলে থাকায় এখন ইচ্ছা থাকলেও নদীর পানি সেচের কাজে ব্যবহারের সুযোগ নেই।” আরেক কৃষক আব্দুস সামাদ জানান, “বর্ষার সময় নদী দিয়ে পানি দ্রুত নেমে যেত। এখন কচুরিপানা আর ঘেরের কারণে পানি আটকে থাকে। এতে ধান আবাদ করা খুব কঠিন হয়ে গেছে।”
রাংসার বর্তমান অবস্থা শুধু কৃষি নয়, পরিবেশের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে, পানির গুণগত মান কমছে। পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও সংকুচিত হচ্ছে। স্থানীয় জেলে নুরুল ইসলাম বলেন, “এক সময় এই নদীতে জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছ তো দূরের কথা, অনেক জায়গায় পানি পর্যন্ত নেই।” স্থানীয়দের অভিযোগ, রাংসা নদীর সিংহভাগ অংশ এখন অর্ধশত জন প্রভাবশালীর দখলে।তবে ভূমি সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে পাওয়া গেছে ২৭ জনের তালিকা।তারাকান্দা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কোন তালিকা মিলেনি। এদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিও। নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁশের বানা দিয়ে বাঁধ, জালের ঘের স্থাপন, পুকুরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে মাছ চাষ এবং তীর দখল করে স্থাপনা নির্মাণ—এসব কর্মকাণ্ডে পানিপ্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু তাহের বলেন, “নদীর জায়গা দখল করে ঘের আর পুকুর বানানো হয়েছে। প্রভাবশালীদের কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।”
আরেক বাসিন্দা রহিমা খাতুনের ভাষ্য, “এই নদী ছিল আমাদের জীবনের অংশ। এখন দেখলে মনে হয় কচুরিপানায় ঘেরা সবুজ জমি। নদীটা যেন চোখের সামনে মরে যাচ্ছে।” উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অবৈধ বাঁধ অপসারণে অভিযান চলছে এবং নদী খননের প্রস্তাব পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—অভিযান কি স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে? তাদের মতে, প্রভাবশালীদের দখল ও অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে নদীকে তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার(ভূমি)এস এম নাজমুস সালেহীন বলেন-রাংসা দখলদারদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে শীঘ্র ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আমিনুল ইসলাম বলেন-নদীটির সম্পর্কে জেলায় সভা অনুষ্ঠিত হলে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নজরে আনবো।নদীটির প্রাণবৈচিত্র ও নদীকেন্দ্রীক জীবন ধারার প্রতি উপজেলা প্রশাসনের সকল সহযোগীতা অব্যাহত থাকবে।
ময়মনসিংহ-হালুয়াঘাট সড়কের পাশে তারাকান্দা বাজার সংলগ্ন রাংসা নদীর অংশে দেখা গেছে,কোটি কোটি টাকার সরকারী জমি দখলের অপচেষ্ঠা চলছে।একদিকে ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট করা হচ্ছে নদীগর্ভ। সেই সাথে তা দখলের নিমিত্তে গড়ে তুলা হচ্ছে স্থাপনা। রাংসা শুধু একটি নদী নয়—এটি একটি জনপদের ইতিহাস, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ধারক। উৎপত্তির গল্প, মান্দি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, নৌপথের দিনগুলো—সব মিলিয়ে রাংসা ছিল জীবনের প্রতীক। বিশেষজ্ঞদের মতে, দখলমুক্তকরণ, নিয়মিত খনন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং খাল-বিল পুনরুদ্ধার ছাড়া রাংসাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো রাংসা নদীকে শুধু গল্পেই জানবে—বাস্তবে নয়।