দানবীর ও গরীবের বন্ধু অসহায়ের সহায় মানুষটির করুণ মৃত্যু!

872

বিপ্লব আহমেদ :: কারো বাড়ি আগুনে পুড়ে গেলে, কেউ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে বা কারো ছেলে মেয়ে স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না এমন খবর পেলেই নিরদ্বিধায় ছুটে যেতেন ডা. শরীফুল ইসলাম। এলাকার অসহায়দের সহায় ছিলেন তিনি। এছাড়া ফরিদপুর-১ আসনের (বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী) উপজেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সহযোগিতা ও পাশে দাঁড়ানো ছিল তার নিত্যনৈমিত্যিক কাজ। এলাকায় ডা. শরীফুল ইসলাম দানবীর ও গরীবের বন্ধু বলে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অসময়ে সেই মানুষটি চলে যাওয়ায় এলাকায় নেমেছে শোকের মাতম। ৬ জানুয়ারি সোমবার সকাল সাড়ে ৬টার সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজের মাইক্রোবাস নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ফরিদপুর সদর উপজেলার মল্লিকপুর নামক স্থানে মামুন পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে ডা. শরীফুল ইসলাম ও পরিবারের ৩ জনসহ মোট ৬ জন নিহত হন। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন ডা. শরীফুল ইসলামের স্ত্রী সুরাইয়া ইসলাম রিম্মি (২৮)।

তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন, ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার পৌর সদরের ছোলনা গ্রামের বাসিন্দা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ওলামাদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ফরিদপুর জেলা ওলামাদলের সভাপতি এবং বোয়ালমারী বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব ডা. শরিফুল ইসলাম শরীফ (৩২), তার মেয়ে তাবাচ্ছুম (৬), শ্যালিকা তাকিয়া (১৪) ও ভাগনি তানজিলা (১৮)। ডা. শরিফুলের বন্ধু ঢাকা হেডকোয়ার্টারে কর্মরত পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর মো. ফারুক আহমেদ (৩৬) ও মাইক্রোবাসের চালক নাহিদ (২৬)। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ডা. শরীফুল ইসলাম পেশায় একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ছিলেন। পাশাপাশি শরীফ হার্ডওয়ার নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। এছাড়া একটি কিন্ডার গার্টেন ও মাদরাসা রয়েছে। তার রোজগারের বেশিরভাগ অর্থ তিনি মানবসেবায় দান করতেন। ডা. শরীফুল ইসলামের জন্মস্থান মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলায়। বিগত ১৭ বছর আগে তিনি ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে আসেন। পরে পৌরসদরের ছোলনা গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি এক কন্যা সন্তানের জনক। দুর্ঘটনায় তার সঙ্গে মেয়েও মারা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা মুন্সি সিরাজুল ইসলাম জানান, ডা. শরীফুল ইসলাম দলমত নির্বিশেষে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতেন। তার জীবনে রোজগারের অধিকাংশ অর্থই মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। মসজিদ মাদরাসায় অনুদান, শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানো এগুলো ছিল তার নিত্যনৈমিত্যিক ব্যাপার। দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে ডা.শরীফুলের মরদেহ পৌরসদরের ছোলনা গ্রামের বাড়িতে নেয়া হয়। তাকে শেষবারের মতো দেখতে হাজারো মানুষ ভিড় জমায়। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে উপস্থিত সকলে। তাদের কান্নায় আশপাশের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। ৬ জানুয়ারি সোমবার বাদ মাগরিব বোয়ালমারী পৌরসদরের ছোলনা মাদরাসা মাঠে ডা. শরীফুল ইসলাম ও তার একমাত্র মেয়ে তাবাচ্ছুমের নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে ছোলনা কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হবে।

নিহত ডা. শরীফুলের ভাই মো. তারিকুল ইসলাম কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, গ্রামের বাড়ি বোয়ালমারীর ছোলনা থেকে সকালে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ডা. শরীফুল ইসলাম মাইক্রোবাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যেই ঘটে এ দুর্ঘটনা। আমার ভাইয়ের এই অসময়ে চলে যাওয়া কোনভাবেই মেনে নিতে পারছি না। জানা যায়, সিলেটের সুনামগঞ্জ থেকে বেনাপোলের উদ্দেশে ছেড়ে আসা মামুন পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মল্লিকপুর নামক স্থানে পৌঁছালে বোয়ালমারী থেকে ঢাকাগামী একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ডা. শরীফুল ইসলাম, তার পরিবারের ৩ জনসহ মোট ৬ জন মারা যান। কানাইপুর হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ এসআই সাফুর আহমেদ দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অতিরিক্ত কুয়াশার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।