ছেলে হত্যার দায়ে আদালতে মামলা করে বিপাকে পরিবার

49

মো: সুজাত আলী: সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ছেলে হত্যার দায়ে আদালতে মামলা করে সুজিয়া বেগম নামের এক দিনমজুরের স্ত্রী বিপাকে পড়েছেন। এলাকার প্রভাবশালী মহলের চাপ ও মামলার আসামিদের হুমকির ফলে চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে নিহত সোহাগের পরিবার। এদিকে এলাকাবাসি স্কুলছাত্র সোহাগের মৃত্যু রহস্য উন্মোচনে লাশ উত্তোলন করে ময়না তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এলাকাবাসি ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথপুর পৌর শহরের পশ্চিম ভবানীপুর গ্রামের প্রভাবশালী মৃত মন্তাজ উল্ল্যার ছেলে ছমির উদ্দিন ও মৃত গজেন্দ্র দাসের ছেলে লিউটন দাস সহ বিভিন্ন লোকজন একই গ্রামের মৃত আঃ রহমান খানের ছেলে আমীর খানের মৌরশী জমি জোড়পূর্বক দখল করে গাছপালা কর্তন করে নিয়ে যায় । এ নিয়ে তাদের সাথে আমীর খানের দীর্ঘদিন যাবৎ আদালতে জমি সংখ্যান্ত বিরোধ মামলা চলে আসছিল ।

চলতি বছরের ১ জুন আমীর খানের ছেলে স্কুল ছাত্র সোহাগ মিয়া(৯) নিখোজ হয় এবং পরদিন সকালে প্রধান আসামী ছমির উদ্দিনের বাড়ির পাশ্ববর্তী স্কুল সংলগ্ন সোহাগের লাশ লোকজন দেখতে পায়। পরে কোন রকম আইনি সহযোগিতা ছাড়াই তরিৎ গতিতে সোহাগের লাশ দাফন করা হয়। ঘটনার ২/৩ দিন পূর্বে সোহাগের পিতা আমির খানের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়ে আসামী ছমির উদ্দিন তাকে প্রাননাশের হুমকি দেয়। হুমকির সূত্র ধরে চলতি বছরের ২৭আগষ্ট আমির খানের স্ত্রী সুজিয়া বেগম তার ছেলে সোহাগকে হত্যার অভিযোগ এনে আমল গ্রহনকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত জগন্নাথপুর জোন সুনামগঞ্জে ছমির উদ্দিনকে প্রধান আসামি করে ১৩ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে উক্ত ঘটনায় থানায় কোন মামলা হয়েছে কিনা জানতে চেয়ে জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করেন। উক্ত বিষয়ে থানায় কোন মামলা হয়নি মর্মে একটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। পরবর্তীতে ৩০ সেপ্টেম্বর অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা যাচাই পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য আদালত জগন্নাথপুর থানাকে নির্দেশ দেন।

সরেজমিন পরিদর্শনে অনেকেই জানান, এলাকার প্রভাবশালী ছমির উদ্দিন, লিউটন দাস সহ অনেকেই আমির খানের মৌরশী জমি দীঘদিন ধরে দখল করে রেখেছে। ছমির উদ্দিন এলাকার একজন খারাপ ও দুর্নীতবাজ লোক। স্বার্থের জন্য তিনি হত্যা সহ যে কোন কাজ করতে পারেন। তার সম্পত্তির সিংহভাগই জবর দখলকৃত ভুমি ও সরকারি সম্পত্তি। তবে তার বিরুদ্ধে এলাকার নিরিহ লোকজন কথা বলতে নারাজ । নিহত সোহাগের পিতা আমির খান জানান, আমার ছেলে সোহাগ নিখোঁজের পরদিন ভোরে একই এলাকার হবিব ও আমির স্কুলের পাশ্ববর্তী স্থানে সোহাগের লাশ পড়ে রয়েছে বলে সংবাদ দেয়। সংবাদ পেয়ে তাদের সহযোগিতায় আমার ছেলে সোহাগের লাশ বাড়িতে নিয়ে আসি। বিষয়টি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলার দ্বিপক কুমার গোপকে, আমার ছেলেকে প্রতিপক্ষের লোকজন হত্যা করেছে এবং লাশের গায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বললে তিনি ধমক দিয়ে বলেন থানা পুলিশ আসলে ঝামেলায় পড়বে। এ সময় পৌর কাউন্সিলর সহ একটি প্রভাবশালী মহল আমার ছেলে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে বলে ভূল বুুঝিয়ে তড়িঘরি করে দাফন সম্পন্ন করে। ছেলের মৃত্যুর শোকে আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। আমার স্ত্রীর দায়েরকৃত মামলা বর্তমানে জগন্নাথপুর থানায় তদন্তাধীন রয়েছে। বর্তমানে আসামী ছমির উদ্দিন ও লিউটন সহ অন্য আসামীদের ভয়ে আমরা এলাকায় চলাফেরা করতে পারছি না। আসামী লিউটন দাস আমাদেরকে প্রানে মারার জন্য দেয়ালে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে রেখেছিল। পুলিশ ঘটনার সত্যতা পেয়েছে।

নিহত সোহাগের মা সুজিয়া বেগম কান্নাজড়িত কন্ঠে এ প্রতিনিধিকে জানান, আমরা নিরীহ অসহায় দিনমজুর পরিবারের লোক। আমার ছেলেকে হত্যা করে লাশ স্কুলের পাশ্ববর্তী স্থানে ফেলে দিয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে বলে আমাদেরকে ভুল বুঝিয়ে কোন আইনের আশ্রয় না নেয়ার জন্য ওয়ার্ড কাউন্সিলার দ্বিপক গোপ আমাদের অনুমতি ছাড়া প্রতিপক্ষ ছমির উদ্দিনসহ অন্য আসামীদের সহযোগিতায় আমার ছেলের দাফন সম্পন্ন করেন। মামলা তুলে নিতে ছমির উদ্দিন ও তার লোকজন নানা ভাবে আমাদের পরিবারকে প্রাননাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এতে আমি সহ আমার পরিবারের লোকজন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ন্যায় বিচারের স্বার্থে আমার ছেলের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়না তদন্ত করলেই এর আলামত পাওয়া যাবে। বর্তমানে যে কোন সময় এলাকার প্রভাবশালী ছমির উদ্দিনের শেল্টারে তার সন্ত্রাসী বাহীনি দিয়ে আমার পরিবারের অন্য সদস্যদেরকেও সোহাগের মত খুন করতে পারে। এ বিষয়ে প্রধান আসামী ছমির উদ্দিনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করলে তিনি সাংবাদিকদের সামনে কোন বক্তব্য না দিয়ে এলাকার প্রভাবশালী, স্থানীয় কাউন্সিলর ও কিছু দুস্কৃতিকারীদের সাথে ফোনে কথা বলে চলে যান ।

এদিকে হত্যা মামলা থেকে রক্ষা পেতে একটি মহল দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে জগন্নাথপুর থানার অফিসার ইনচার্জ ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। মামলার বাদি সুজিয়া বেগম তার ছেলে সোহাগ হত্যার বিচার ও তার পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ আইন শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর সু-দৃষ্টি কামনা করছেন।