পেঁয়াজের আকাশ ছোঁয়ার রহস্য.!

63
নূরুল আলম আবির: পেঁয়াজের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। বাঙ্গালির রান্নার নিত্যসঙ্গী পেঁয়াজ যেন ময়ূরপক্ষী হয়ে আকাশে উড়ছে। উড়ছে তো উড়ছেই। নামার কোনো লক্ষণ চোখে পড়ছে না। দুই/তিন সপ্তাহ আগে পার্শ্ববর্তী বন্ধু দেশ ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এই অজুহাতে পেঁয়াজের মূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। প্রথম ধাপে পেঁয়াজ শতক অতিক্রম করে সবাইকে জানিয়ে দেয় যে, সে অপ্রতিরোধ্য। তাকে থামানো যাবে না। প্রশাসন থেকে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বহু কষ্টে পেঁয়াজের মূল্য আশির কোঠায় নামানো হয়। কিন্তু এক কিছুদিন পরই পেঁয়াজ দিল আকাশ ছোঁয়া লম্ফ। ১১০ থেকে ১২০ তারপর ১৫০ পেরোলো। এরপরও পেঁয়াজের মূল্য থামেনি। লাফাতে লাফাতে তা আজ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় পৌঁছল।
এভাবে পেঁয়াজের লাফিয়ে লাফিয়ে দাম হাকানোর রহস্য কি.? সরকারও যেন জানে না। জানে না সাধারণ মানুষ। অনেকের জন্য পেঁয়াজ হয়ে উঠেছে সোনার হরিণ। একসাথে পাঁচ/দশ কেজি পেঁয়াজ কেনার লোকটা ২৫০ গ্রাম কিংবা ৫০০ গ্রাম পেঁয়াজ কিনেই বাড়ির চাহিদা মেটাচ্ছে কোনোমতে। বাঙালির এই নিত্যপণ্যটির লম্ফ মূল্যে সাধারণ ক্রেতাদের দিশাহীন অবস্থা। পেঁয়াজের এমন আকাশ ছোঁয়া মূল্যে শ্বশুর বাড়ির জামাইও বেড়াতে গিয়ে পেঁয়াজ নিচ্ছেন সাথে করে। বিয়ের উপঢৌকন স্বরূপও কেউ কেউ পেঁয়াজ নিয়ে হাজির। আতংকের সাথে সময়ের সেরা কৌতুকে পরিণত হয়েছে সোনালি রঙের এই পরম আকাঙ্খিত পেঁয়াজ।
সরকার পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতিমধ্যেই তুরস্ক, মিসর, আফগানিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জরুরিভিত্তিতে কার্গো বিমানযোগে পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা দিয়েছে। মঙ্গলবার মিসর থেকে আসছে পেঁয়াজের বিমানযোগে প্রথম চালান। এভাবে পর্যায়ক্রমে বাকী দেশগুলো তেকেও পেঁয়াজ আসবে। বিমানযোগে পেঁয়াজ আসছে, পেঁয়াজ আসছে জাহাজ যোগে। সংকট চলাকালীন সময়েও প্রচুর পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। পাইকারদের মতে, পেঁয়াজের মজুদ কম হওয়ায় দাম বাড়ছে। কিন্তু সংকটের সাথে সাথে আমদানি বাড়লেও কমেনি পেঁয়াজের দাম। যেতে যেতে পেঁয়াজের মূল্য ৩০০ ছাড়াল।
এদিকে পেঁয়াজের দাম এক সপ্তাহের মধ্যে না কমলে হস্তক্ষেপ করবে আদালত। আদালত বলেছেন, আপনারা এক সপ্তাহ দেখেন। এর মধ্যে যদি পেঁয়াজের মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয় তাহলে আমরা হস্তক্ষেপ করব। রবিবার এ সংক্রান্ত রিটের শুনানি করতে গেলে বিচারপতি মোঃ নজরুল ইসলাম  তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলম সমন্বয় গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ রিটকারীর উদ্দেশ্যে এ আদেশ দেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বেশ কয়েকটি টিম দেশের বিভিন্ন জায়গায় জরিমানা ও দণ্ড প্রদান করেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না পেঁয়াজের মূল্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেঁয়াজ নিয়ে বিভিন্ন রকমের রঙ্গরসাত্মক মন্তব্য চোখে পড়ছে। কেউ কেউ বলছে, পেঁয়াজ পুরষদের কাঁদাচ্ছে বাজারে আর নারীদের কাঁদাচ্ছে ঘরে। কেউ আবার বলছে, পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দেবে।
যে যা-ই বলুক। পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে হবেই। এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে একটি শক্ত সিন্ডিকেটই জড়িত। এর সাথে সরকারি বেসরকারি অধিক মুনাফালোভী মজুদদাররা জড়িত। ইতমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বস্তাবন্দি পঁচা পেঁয়াজ ফেলে দিতে দেখা যাচ্ছে। মজুদদাররা যে কারসাজি করে পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই কারসাজি করে ইতিমধ্যেই সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্টরা হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে। এত কিছুর পরও সরকারকে বসে থাকলে চলবে না। সিন্ডিকেট ভেঙে পেঁয়াজের মূল্য আনতে হবে জনগণের নাগালের মধ্যে। দেশের গোয়েন্দা সংস্থাসহ সকল সেক্টর একযোগে কাজ করলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ অসম্ভব নয়। পাশাপাশি জনসাধারণেরও ভূমিকা কম নয়। দেশপ্রেমিক নাগরিকদের উচিত এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে সহযোগিতা করা। দেশের সরকারি দল ও বিরোধী দল একসাথে কাজ না করলে এ সমস্যা আমাদেরকে অনেকটাই ভোগাবে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবো আমরা সবাই। আশা করছি এ সমস্যার সমাধান অচিরেই হবে। জয় হবে মানবতার। এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
লেখকঃ
কবি, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
১৭ই নভেম্বর ২০১৯ ইং।