ট্রেন দুর্ঘটনারোধে আমাদের করণীয়

43

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক: সড়ক পরিবহন আইন যখন আশা আলো দেখাচ্ছে ঠিক তখন সড়কে অকাতরে প্রাণ ঝরছে। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে। কোনোক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু রোধকরা যাচ্ছে না। অরক্ষিত লেভেলক্রসিং, অপরিকল্পিত ও অননুমোদহীন সংযোগ এবং অসচেতনতার কারণে অকাতরে মানুষ নিহত হচ্ছে। আলোচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ১৬ জন। ভোর পৌনে ৩টার দিকে কসবা উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনায় ১৬ জন নিহত ও শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় ট্রেনচালকের উন্নত প্রশিক্ষণের অভাবে দুই ট্রেন সংঘর্ষের ঘটনা সংঘটিত হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পেছনে অবহেলার অভিযোগ অন্যতম। গত একটি প্রতিবেদন দ্বারা জানা যায় আড়াই বছরে রেল দুর্ঘটনায় (নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-গাজীপুর) নিহত আট শতাধিকলোক। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন ছয় শতাধিক। রেলওয়ে পুলিশের হিসাব মতে নিহতের সংখ্যা ৭০০ জন। বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) কমলাপুর থানার সূত্রে ২০১৫ সালে রেল দুর্ঘটনায় নিহত সংখ্যা ২৯২ জন। তন্মধ্যে পুরুষ ২৪৮ জন, নারী ৪৪ জন। অপমৃত্যু (ইউডি) মামলাসহ মোট মামলা ২৮৫টি। ২০১৬ সালে রেল দুর্ঘটনায় নিহত সংখ্যা ৩০৫ জন। তন্মধ্যে মধ্যে পুরুষ ২৪৪ জন, নারী ৬১ জন। (ইউডি) মামলাসহ মামলা ৩০৫টি। গত বছর জানুয়ারি থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত নিহত সংখ্যা ১০৩ জন। তন্মধ্যে শুধু জানুয়ারিতে ৩২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৫ জন, মার্চে ২৩জন এবং এপ্রিলে নিহত সংখ্যা ২২ জন। অরক্ষিত লেভেলক্রসিং, অপরিকল্পিত সংযোগ সড়ক এবং অসচেতনতার অভাবের পাশাপাশি রেলে দুর্ঘটনার পেছনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অব্যবস্থাপনাও দায়ী মনে করা হয়। রেলওয়ের বিশেষজ্ঞদের অভিমত, তিন কারণে রেল দুর্ঘটনা সংঘঠিত হয়। তন্মধ্যে লেভেলক্রসিং, সিগন্যাল লাইনে ত্রুটি এবং উন্নয়নকাজ চলা অবস্থায় ট্রেন লুপ লাইন অথবা সাইডলাইনে চলে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হতে দেখা যায়। রেল যাতায়াত অনেকটা সাশ্রয়ী, আরাম দায়ক ও নিরাপদ হওয়ায় কারণে অনেকে রেলে ভ্রমন করে থাকেন। সরকারও তার সঠিক কর্ম পরিকল্পনা মোতাবিক রেল উন্নয়ন কাজ করে যাচ্ছে। মেট্রো রেলও চালু হতে যাচ্ছে আমাদের দেশ। ভবিষ্যতে রেলপথ বৃদ্ধিপাবে। সেই তুলনায় নিরাপদ হয়নি রেল যোগাযোগ। রেলপথের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বা হবে, এখনো স্পষ্ট নয়। দেশে দুই হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথে প্রায় দুই হাজার ৫৪১টি লেভেলক্রসিং। অনেক জায়গায় কোনো গেঁম্যান নেই। সংকেতবাতি ও যান নিয়ন্ত্রণের কোনো কর্মীও নেই। শহরের বাইরে অনেক ব্যস্ততম লেভেলক্রসিং রয়েছে। দুই-একটি স্থানে গেটম্যান আছে, তবে বেশির ভাগ লেভেক্রসিংয়ে গেটম্যান নেই। মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক, গ্রাম্য সড়ক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে রয়েছে অনেক লেভেলক্রসিং। ট্রেনের টাইমে অনেক লেভেলক্রসিং এলাকার সাধারণ জনগণ নিজ দায়িত্বে গেটম্যানের কাজ করে। তার পরও অহরহ ট্রেন দুর্ঘটনা হচ্ছে। ললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক নিয়ে যেতে হলে গেট নির্মাণ, কর্মী নিয়োগসহ আনুষঙ্গিক স্থাপনা নির্মাণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থার। সর্বশেষ ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ১৬ জন। নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়া, তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা একান্ত জরুরি মনে করি। নতুন পরিবহন আইন নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা কমছে না। একটি ঘটনার রেশ না কাটতেই আরেকটি ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ হচ্ছে। এসব ঘটনায় হতাহতের সংখ্যাও অনেক। রেল যোগাযোগ নিরাপদ করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা ও প্রতিকার অত্যন্ত জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু একটি পরিবারে গভীর শোক ও ক্ষত সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে পরিবারকে। কোনো দুর্ঘটনায় একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি যদি প্রাণ হারায়, তখন পরিবারের কী অবস্থা হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা পঙ্গুত্ববরণ করে তাদের পরিবারের অবস্থা আরো শোচনীয়। একটি প্রতিবেদ থেকে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে বছরে গড় বাংলাদেশের জিডিপির দেড় শতাংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়, যার পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা। ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৫৫ হাজার মানুষ। দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছে প্রায় ৭৭ হাজার। সড়ক দুর্ঘটনা জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সমস্যা থেকে মানুষকে মুক্ত রাখার সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যে কারণে সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় তন্মধ্যে দেশে সড়ক অবকাঠামো এবং স্থলভাগের আয়তন অনুপাতে জনসংখ্যার চাপ বেশি। সড়কের তুলনায় মোটরযান বেশি। একই সড়কে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, রিকশাসহ মিশ্র যানবাহন। সড়ক ও মহাসড়কগুলো বেশ ত্রুটিপূর্ণ। দেশের মহাসড়কে অনেক স্থানেই রয়েছে বিপজ্জনক আকা-বাঁকা পথ। এসব আকা-বাঁকা পথের জন্য প্রায়ই জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া অবকাঠামোগত কারণেও দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকি খুব বেশি মনে করেন বিশেষজ্ঞগণ। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যেসব কারণ দায়ী তার মধ্যে চালকের অসতর্কতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো। এই সমস্যা বারবার চিহ্নিত হলেও এর কোনো প্রতিকার নেই। সড়ক দুর্ঘটনা হয় না এমন কোনো দেশ নেই। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি যত কমিয়ে আনা যায়, সেটিই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। ভালো যান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক, সড়কব্যবস্থা উন্নতকরণ, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও যুগোপযোগী করার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনায় পতিতদের ত্বরিত চিকিৎসা দেয়া অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় আইনি জটিলতার কারণে আহতদের চিকিৎসা দিতে সমস্যা হয়। এ সমস্যাটি সমাধানের ব্যবস্থা নিতে হবে। রেল ও সড়কপথে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। বিনিয়োগ বাড়ছে। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাও বৃদ্ধি পেয়েছে। মেট্রো রেল হচ্ছে। রেলের আধুনিকায়ন এখন দৃশ্যমান। অপরদিকে উড়াল সড়ক, মহাসড়কগুলো কোথাও চার লেন, কোথাও আবার আট লেন করার কাজ এগিয়ে চলছে। কিন্তু দুখজনক হলেও সত্য যে, সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। রেল ও সড়কপথ নিরাপদ হওয়া দেশের মানুষের একমাত্র চাওয়া। দেশে লাশের মিছিল মানুষ দেখতে চায় না। এটাই আমাদের সকলের প্রত্যাশা।
লেখক : প্রাবন্ধিক