কোন বিশ্বাসের যুক্তিতে মসজিদের জায়গায় মন্দির:- ভারতের সাবেক বিচারপতি

85

আর্ন্তজার্তিক ডেস্ক: কয়েক দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি নিয়ে করা ঐতিহাসিক অযোধ্যা মামলার রায় শনিবার ঘোষণা করেছে ভারতের সুপ্রিমকোট। রায়ে অযোধ্যার বিরোধীপূর্ণ বাবরি মসজিদের জমি মন্দির নির্মাণে হিন্দুদের দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর মুসলমানদের জন্য আলাদা অন্য জায়গায় ৫ একর জমি বরাদ্দ দিতে আদালতের নির্দেশ।

ভারতের সাবেক বিচারপতি অশোককুমার গঙ্গোপাধ্যায় আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন ‘এই রায়টা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হল, সবটা ঠিক বুঝতে পারছি না। সুপ্রিমকোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সেই আদালত একটা রায় দিয়ে দিলে তাকে মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর আমি পাচ্ছি না।

চারশো-পাচঁশো বছর ধরে একটা মসজিদ একটা জায়গায় দাড়িয়ে ছিল। সেই মসজিদকে আজ থেকে ২৭ বছর আগে ভেঙে দেয়া হল বর্বরদের মতো আক্রমন চালিয়ে। আর আজ দেশের সবোর্চ্চ আদালত বল ওই খানে এ বার মন্দির হবে। সাংবিধানিক নৈতিকতা বলে তো একটা বিষয় রয়েছে। এমন কোনও কাজ করা উচিত নয়, যাতে দেশের সংবিধানের উপর কারও ভরসা উঠে যায়। আজ অযোধ্যার ক্ষেত্রে যে রায় হল, সে রায়কে হাতিয়ার করে ভবিষ্যতে এই রকম কান্ড আরও ঘটানো হবে না, সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন?

শুধু অযোধ্যায় নয়, মথুরা এবং কাশীতেও একই ঘটনা ঘটবে- এ কথা আগেই বলা হত। যারা গুন্ডামি করে বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ছিলেন তারাই বলতেন। এখন আবার সেই কথা বলা শুরু হচ্ছে।

যদি সত্যিই মথুরা বা কাশীতে কোনও অঘটন ঘটানো হয় এবং তার পরে মামলা-মোকদ্দমা শুরু হয়, তা হলে কী হবে? সেখানেও তো এই রায়কেই তুলে ধরে দাবি করা হবে যে, মন্দিরের পক্ষে রায় দিতে হবে বা বিশ^াসের উপর রায় দিতে হবে।

অযোধ্যা মামলা এর আগেও সুপ্রিম কোর্টে উঠেছে। তখনই আদালত স্বীকার করে নিয়েছিল যে, বিতর্কিত জমিতে মসজিদ ছিল। যেখানে বছরের পর বছর ধরে নামাজ পড়া হচ্ছে, সে স্থানকে মসজিদ হিসেবে মান্যতা দেওয়া উচিত, এ কথা আদালত মেনে নিয়েছিল।

তাহলে আজ এই নির্দেশ এল কী ভাবে? যেখানে একটা মসজিদ ছিল বলে সুপ্রিম কোট নিজেই মেনেছে, সেখানে আজ মন্দির বানানোর নির্দেশ সেই সুপ্রিম কোর্টই দিচ্ছে কোন যুক্তিতে?

ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (এএসআই) জানিয়েছিল, ওই মসজিদের তলায় একটি প্রাচীনতর কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু সেই প্রাচীনতর কাঠামো যে মন্দিরই ছিল, এমন কোনও প্রমাণ তো মেলেনি। সুপ্রিম কোর্ট নিজেও মেনে নিয়েছে যে, পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষনের রিপোর্টে কোনও ভাবে প্রমাণ হচ্ছে না যে, একটা মন্দির ভেঙ্গে ওইখানে মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল।

তাহলে কিসের ভিত্তি আজ মন্দির তৈরির নির্দেশ? বিশ^াসের ভিত্তিতে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলল, অনেক হিন্দুর বিশ্বাস যে, ওখানে রামের জন্ম হয়েছিল।

বিশ্বাস বা আস্থার মর্যাদা রাখতে ও বিতর্কিত জমি রামলালা বিরাজমানের নামে দিয়ে দেওয়া হল। এটা কি অদৌ যুুক্তিযুক্ত হল? রামচন্দ্র অদৌ ছিলেন কি না, কোথায় জন্মেছিলেন, সে সবের কোনো প্রামাণ্য নথি কি রয়েছে? নেই।

রাম শুধু মহাকাব্যে রয়েছেন। সেই সূত্রে অনেক মানুষের মনে একটা বিশ্বাস রয়েছে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের বলে একটা মসজিদের জমি মন্দিরের নামে হয়ে যেতে পারে না।

কালকে যদি আমি বলি, আপনার বাড়ি নীচে আমার একটা বাড়ি রয়েছে, এটা আমার বিশ^াস, তা হলে কি আপনার বাড়িটা ভেঙ্গে জমিটা আমাকে দেওয়া হবে।

বাবরি মসজিদ যে ওখানে ছিল, পাঁচ শতাব্দী ধরে ছিল, সে আমরা সবাই জানি। বাবরি মসজিদ যে গুন্ডামি করে ভেঙ্গে দেওয়া হল, সেটাও আমরা দেখেছি।

এমনকি সুপ্রিম কোর্ট এদিনের রায়েও মেনে নিয়েছে যে, অন্যায় ভাবে মসজিদটা ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৫২৮ সালের আগে ওখানে রাম মন্দিও ছিল কিনা, আমরা কেউ কি নিশ্চিত ভাবে জানি? রাম মন্দির ভেঙ্গে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। এমন কোনও অকাট্য প্রমাণ কি কেউ দাখিল করতে পেরেছিলেন? পারেননি। তা সত্ত্বেও যে নির্দেশটা শীর্ষ আদালত থেকে এল, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকাটা স্বাভাকি নয় কি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here