৩৫ বস্তি ও ৫ দলের ভোটের অংকে ভয় বড় দুই দলের!

16

বরিশাল প্রতিনিধি  //

ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ দল বেঁধে ছুটে আসছে কীর্তনখোলায়। কারো হাতে কাপড়চোপড়, কারো হাতে হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন। কংক্রিটের বাঁধানো ঢাল পেয়ে জনে জনে নেমে পড়ছে জলে। কেউ ডুব-সাঁতারে মেতে ওঠে গোসলে, কেউ বা সাবান বা ছাই মেখে হাঁড়ি-পাতিল মাজতে ব্যস্ত। এসব মানুষ বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার স্টেডিয়াম বস্তি বা বঙ্গবন্ধু কলোনি, কেডিসি বা বালুর মাঠ বস্তি, ভাটারখাল বা ঈদগাহ বস্তি, কোস্টাল বা বরফকল বস্তির বাসিন্দা। ওই সব বসতিতে নেই  পানি সরবরাহ। খাবার পানির ভরসা শুধু কিছুসংখ্যক গভীর নলকূপ।

গোসল সেরে তীরে উঠে বস্তির বাসিন্দা রেহানা খাতুন হাসতে হাসতে বললেন, ‘নদীর পানিতে ডুব দিয়া ঠাণ্ডা মাথায় ভোটের হিসাব করতে খুব ভালোই লাগে। কারে ভোট দিমু হেইডা ঠিক কইরা হালাইছি। তয় পরে মত পাল্টায় কিনা হেইয়া পরে বুঝমু, যে আমাগো বেশি সুযোগ-সুবিধা দিব হেরেই তো ভোট দিমু, আমাগো মতন মাইনষের কাছে এইডাই সোজা হিসাব।’আগামী ৩০ জুলাইয়ের নির্বাচনে রেহানা খাতুনদের মতো ৩৫টি বস্তির প্রায় ৩৩ হাজার ভোটারের ভাবনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রতিবার ভোটের সময় তাই-ই হয়, বিশেষ করে মেয়র পদে প্রার্থীদের ক্ষেত্রে।

শুধু কি বস্তির ভোট! বড় দুই দলের আরেক ভয় পাঁচটি রাজনৈতিক দলের ভোটের কাটাছেঁড়া নিয়ে। নিজ নিজ সম্ভাব্য প্রাপ্ত ভোটের হিসাব-নিকাশের বাইরে একই পদের অন্য প্রার্থীদের ভোটের হিসাব ভালোভাবেই কষতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা। কোনো দলের প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থীর ভোট বেশি পেলে যেমন বিএনপি খুশি হবে, আবার কোনো দলের ভোট বেশিতে খুশি হবে আওয়ামী লীগ। ফলে সাধারণ মানুষের ভাষায় এখানে এবার বড় দুই দলের মেয়র প্রার্থীর জন্য ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে এই অঙ্ক।

ভোটের অঙ্ক নিয়ে ভয়ের কারণ কী—এমন প্রশ্নের জবাবে বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. গাজী জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে নিজের বিশ্লেষণ জানিয়ে বলেন, বস্তির ভোটারদের অনেকে নির্দিষ্ট কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের নিবেদিত কর্মী-সমর্থক হলেও তাদের বাইরে বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক আদর্শ বা প্রতীকের সঙ্গে থাকে না। ভোটের এক-দুই দিন আগে বিভিন্ন প্রভাব বা প্রলোভনে তাদের আগের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে। ফলে এ ধরনের ভোটারদের নিয়ে আস্থার সংকটে ভোগেন কমবেশি সব প্রার্থী।

বস্তিতে যত ভোট : ২০১৫ সালে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহযোগিতায় বরিশাল সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগরীর বস্তিগুলোতে জরিপ পরিচালনা করা হয়। ইউএনডিপির ওই কার্যক্রমের তৎকালীন টিম লিডার কমল ব্যানার্জী কালের কণ্ঠকে বলেন, বরিশাল নগরের ৩৫টি বস্তিতে জনসংখ্যা ৪৯ হাজার ৬৩৮। নারী ১৫ হাজার ১৮০ জন এবং পুরুষ ১৩ হাজার ৫৪৫ জন। এ ছাড়া ১৮ বছরের নিচে ছেলে-মেয়ে মিলে ২০ হাজার ৯১৩ জন। এর মধ্যে জনসংখ্যা গণনা সূত্রের একটি আঙ্গিকে বছরে ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি ধরে জনসংখ্যার হিসাব বের করা হয়। ওই সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে ৩৫ বস্তির প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বা ভোটারের সংখ্যা ৩৩ হাজার হিসাব করা হচ্ছে। বস্তিগুলোর মধ্যে ১৩টি বস্তি নিয়েই নগরের ৫ নম্বর ওয়ার্ড। ওই ওয়ার্ডের চরবদনায় ৯টি, দক্ষিণ পলাশপুর, উত্তর পলাশপুর, মোহাম্মদপুর, মোহাম্মদ হোসাইন গণি বস্তি রয়েছে। এ ওয়ার্ডে ভোটার ১২ হাজার ৩৩৭ জন। ১০ নম্বরে রয়েছে আটটি বস্তি। ভাটারখাল, বরফকল, বালুর মাঠ, বুড়িবাড়ী, ব্যাপ্টিস্ট মিশন, স্টেডিয়াম বস্তিতে ভোটার হচ্ছে ছয় হাজার ৭২৫ জন। ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আছে পাঁচটি বস্তি—হাটখোলা শিশু পার্ক, হাটখোলা পূর্ব চর, হাটখোলা-কলাপট্টি, কালি বাবুর খেয়াঘাট ও গগন গলি। ভোটার চার হাজার ৩২২ জন। ৩ নম্বর ওয়ার্ডে লাকুটিয়া খালের পাড়, পশ্চিম মতাসার ও মতাসার কলোনিতে চার হাজার ৪৭৬ ভোটার রয়েছে। শুধু মতাসারে ভোটার হচ্ছে এক হাজার ৫৫৬ জন। ২ নম্বর ওয়ার্ডের কালাখাঁর বাড়ী ও কাউনিয়া খ্রিস্টান কলোনিতে জনসংখ্যা দুই হাজার ৭৮৪।

পাঁচ দলের ভোটের ভয় দুই দলের : বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থীদের কাছে ভোটের হিসাবে এবার বেশ নাড়া দিয়েছে আরো পাঁচটি রাজনৈতিক দলের [জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)] ভোটের অঙ্ক; যদিও জামায়াতের কোনো মেয়র প্রার্থী নেই বা এই পদে কাউকে সমর্থন দিয়ে প্রকাশ্য কোনো নির্বাচনী তত্পরতাও নেই দলটির। গোপনে বিএনপির প্রার্থীর লোকজনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক বা আলাপ-আলোচনা ছাড়া কিছুই করছে না দলটি। এ ক্ষেত্রে সবাই সামনে নিয়ে আসছে ২০০৮ সালের সিটি নির্বাচনে মাত্র ৫৫ ভোটের ব্যবধানে নির্ধারিত হওয়া মেয়র পদের জয়-পরাজয়ের বিষয়টি। ওই সময় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সারফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টু মাত্র ৫৫ ভোটে হেরে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের শওকত হোসেন হিরনের কাছে। ফলে এখনো বিএনপি বা আওয়ামী লীগের কাছে ওই অঙ্কটি ভয়ের কারণ হয়ে আছে বলে উভয় দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়; যদিও এর বিপরীতে নতুন ভোটারদের নিয়ে আশায় আছে দুই দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা।

বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির নেতা অধ্যাপক জাহিদ হোসেন বলছিলেন, বস্তির হিসাবের সঙ্গে এবার বড় দুই দলের মেয়র প্রার্থীদের এক ধরনের অন্তর্জ্বালা হয়ে উঠেছে অপেক্ষাকৃত ছোট দলের চার প্রার্থীর সম্ভাব্য ভোটপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ। যেমন—প্রকাশ্যে বা সক্রিয় নির্বাচনে না থাকলেও জামায়াতের সাধারণ সমর্থকদের ভোট সরাসরি বিএনপির পক্ষে যেতে পারে, তেমনি জাতীয় পার্টি, বাসদ ও সিপিবি যত বেশি ভোট পাবে ততই এর পরোক্ষ সুফল যেতে পারে বিএনপির ঘরে। কারণ সাধারণ হিসাবে কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টি এখানে পৃথক কোনো প্রার্থী না দিলে সেই ভোটের অন্ততপক্ষে বড় অংশই আওয়ামী লীগের বাক্সে যেত, আবার বাসদ কিংবা সিপিবির সম্ভাব্য প্রাপ্ত ভোটও কাটা যাবে আওয়ামী লীগের হিসাব থেকেই। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী না থাকলে তাদের ভোট বিএনপির পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল। এখন ওই দলের প্রার্থী থাকায় তাদের সম্ভাব্য প্রাপ্ত ভোটের পরোক্ষ সুফল কিছুটা হলেও আওয়ামী লীগকে স্বস্তি দেবে।

অধ্যাপক জাহিদ আরো বলেন, যদিও ছোট দলগুলোর পক্ষ থেকে নিজেরা যত ভোট পেতে পারে বলে এখানে-সেখানে বলাবলি করছে তত ভোটার আসলে তাদের নেই। বিগত সময়ের হিসাব থেকে তেমনটাই মনে হচ্ছে। অর্থাৎ তারা অনেকটাই বাড়িয়ে বলছে বা প্রত্যাশা করছে। আর তাদের প্রত্যাশা সত্যি হলে তো বড় দুই দলের ভোটই প্রায় নেই হয়ে যায়!জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, ‘সাংগঠনিকভাবেই আমাদের অবস্থান খুব ভালো। ভোটারদের কাছ থেকেও সাড়া পাচ্ছি। আমাদের বিশ্বাস, সুষ্ঠু ভোট হলে জাতীয় পার্টি জিতবে।’ তিনি মনে করছেন, অন্তত ৭০ হাজার ভোট লাঙল প্রতীকে পড়তে পারে।

মহানগর জামায়াতের আমির মোয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, সরকারের নির্যাতনে নেতাকর্মীরা ধানের শীষের পক্ষে নামতে পারছে না। দলের প্রায় কর্মী-সমর্থক মিলিয়ে ২০ হাজারের বেশি ভোট রয়েছে। এর বাইরেও জামায়াতকে ভালোবাসেন; কিন্তু কখনোই জামায়াতের পক্ষে প্রকাশ্যে কর্মকাণ্ডে অংশ নেন না এমনও সমর্থক রয়েছে।বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ‘শ্রমজীবীদের জন্য কাজ করেছি। কাজ করতে গিয়ে নির্যাতন আর মামলার শিকার হয়েছি। অটোরিকশাচালকদের পরিবারসহ প্রায় ১০ হাজার রিজার্ভ ভোট রয়েছে। পাশাপাশি বস্তির বাসিন্দারাও আমাকে ভোট দেবেন। আমার বিশ্বাস ভোটাররা আমার কাজের মূল্যায়ন করবেন।’

সিপিবির মেয়র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘প্রতিদিন হেঁটে ভোটারদের কাছে যাচ্ছি। ভোটাররা আমাকে আশ্বস্ত করছেন। আমার পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কর্মীরা কাজ করছেন। অধিকাংশই শ্রমিক সংগঠন নির্দলীয়। প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক আমাকে ভোট দেবেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন।’ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থী ওবায়দুর রহমান মাহবুব বলেন, তাঁদের প্রত্যাশিত ভোট আছে ৫০ হাজারের মতো। এর সঙ্গে হেফাজতের অনুসারীরাও রয়েছে। সুষ্ঠু ভোট হলে হাতপাখা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here