ভারত-পাকিস্তান মতপার্থক্য এবং সার্কের ভবিষ্যৎ

30

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সংক্ষেপে সার্ক) দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর সংগঠন। এর জন্ম ১৯৮৫ সালে। সার্ক সনদ সই হয় ঢাকায় ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর। এ সনদে সই করেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, ভুটানের রাজা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট, নেপালের রাজা এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। পরবর্তী সময়ে এ গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয় শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান।

বর্তমানে এ সংগঠনের প্রধান কার্যালয় নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে। সার্ক সনদের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি, সামাজিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কল্যাণ এবং তাদের জীবন-মানের উন্নতি। সনদে পারস্পরিক আস্থা নির্মাণ, পরস্পরের সংকট অনুধাবনের বিষয়গুলোও স্বীকৃতি পায়।

সন্ত্রাস প্রসঙ্গে পাকিস্তানের অসাধু দৃষ্টিভঙ্গি ও ভারতের সঙ্গে সংকট তৈরির নীতির কারণে সার্ক স্থবির হয়ে পড়ে, এখন সংস্থাটি মৃতপ্রায়। প্রশ্ন উঠতেই পারে, পাকিস্তানের এমন তৎপরতা কার স্বার্থে? জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব দাগ হ্যামারশোল্ড ১৯৬১ সালে বলেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন বা অন্য কোনো শক্তিধর দেশের জাতিসংঘের কাছ থেকে সুরক্ষার প্রয়োজন নেই। এর সুরক্ষা প্রয়োজন অন্যান্য দেশের। এ অর্থে দেখতে গেলে, জাতিসংঘ হচ্ছে সেই সব দেশের সংগঠন। কিন্তু একই কথা সার্কের ক্ষেত্রে হলফ করে বলা যায় না।

উপযুক্ত কারণ ছিল বলেই পাকিস্তানে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের বিরোধিতা করেছে ভারত। পাকিস্তান দুই প্রতিবেশী দেশে অব্যাহতভাবে সন্ত্রাসের সমর্থন দিয়ে চলেছে। আর এ কারণেই সেখানে সার্ক সম্মেলন আয়োজনের বিরোধিতা করে ভারত ও আফগানিস্তান। মোটর ভেহিকল চুক্তির মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে বিরোধিতা করে পাকিস্তান এর মধ্যে নিজেকে প্রতিক্রিয়াশীল এবং বাধা প্রদানকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

সার্কের অকার্যকারিতায় এর সদস্য বহু দেশ গত কয়েক বছরে অশান্ত হয়ে উঠেছে। নেপাল সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের ব্যাপারে বারবার এবং অব্যাহতভাবে দাবি জানিয়ে চলেছে। সম্মেলন আয়োজনে আগ্রহ দেখিয়েছে শ্রীলঙ্কাও। চীনপন্থী বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের চাপে মালদ্বীপ সম্মেলন আয়োজনের দাবিদার হলেও তারা চীনের কার্যসূচিই বাস্তবায়ন করতে চাইবে এমন ধারণা করা হচ্ছিল।

সার্ক সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক সহযোগিতা ‘অবশ্যই পারস্পরিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বিকল্প হতে পারে না। বরং এগুলোর পরিপূরক হবে।’ সে সময় অবশ্য কেউই অনুভব করতে পারেনি যে একটি দুর্বিনীত দেশের আচরণের কারণে যে দ্বিপক্ষীয় মতবিরোধ তৈরি হবে সেটা সার্ককে স্থবির করে দিতে পারে। বর্তমানের অচলাবস্থা পারস্পরিক আদান-প্রদানকে সম্পূর্ণভাবে স্থবির করে দিয়েছে।

পাকিস্তান মনে করে, অনুচ্ছেদ তিন অনুসারে সদস্য দেশগুলোর সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন অবশ্যই অনুষ্ঠিত হতে হবে। কোনো সদস্যের ভেটোর কারণে এ সম্মেলন বাতিল হয়ে যাবে না। বিশেষ অধিবেশনের ক্ষেত্রে সবার মতামতের প্রয়োজন হবে এবং সে ক্ষেত্রে ভেটো প্রদান করা যাবে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় ও বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। এ অনুচ্ছেদের আশ্রয় নিয়ে পাকিস্তান জানায়, ‘দ্বিপক্ষীয় বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলোর সমাধান’ বার্ষিক সার্ক সম্মেলন আয়োজনের পূর্বশর্ত নয়। কিন্তু পাকিস্তান ভুলে গেছে, সন্ত্রাস কখনোই সার্কের আলোচনার বাইরের কিছু ছিল না; হতেও পারে না। ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে সার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সন্ত্রাস দমনে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক সম্মেলন সম্পন্ন করেছিলেন।

সমন্বিত আঞ্চলিক সম্মেলনের প্রতিশ্রুতি যদি পাকিস্তান ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে তা সার্কে তোলা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী দেশ অবশ্যই আওয়াজ তুলবে এবং পুরো বিশ্ব তা শুনবে। ভারত ও আফগানিস্তান অনেক দিন ধরেই পাকিস্তানের মদদে যে সন্ত্রাস চলছে তার শিকার। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি নেতৃত্ব এ ইস্যুটিকে নিপুণতার সঙ্গে ‘বিতর্কিত রাজনৈতিক ইস্যু’ অভিহিত করে, যাতে সার্কে এ নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

১৯৮৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। পঞ্চম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের পর প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর ভারতের পার্লামেন্টে বলেছিলেন, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঞ্জাবে ও কাশ্মীরে জঙ্গিবাদী তৎপরতায় ‘সীমান্তবর্তী সহযোগিতা’ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

দিন যতই পার হয়েছে ততই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ভারত ও পাকিস্তানের মতপার্থক্য দূর করা না গেলে সার্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে বশে আনাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

সূত্র : নিউ দিল্লি টাইমস অনলাইন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here