নির্বাচনী বাতাস : যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ

46

মিশেল ওবামার একটি ভিডিও দেখেছি। তিনি আরজি জানাচ্ছেন, ভোটার হয়নি এমন মানুষের কাছে। তারা যেন সময় নষ্ট না করে এখনই ভোটার রেজিস্ট্রেশন করে। তারা ভোট কাকে বা কোন পার্টিকে দেবে সে প্রশ্ন তিনি তোলেননি। তিনি বললেন, তাদের কর্তব্য ভোটার হওয়া এবং তার যথাযথ প্রয়োগ করা। আমেরিকান এমন অনেক মানুষ আছে, তারা ভোটার হয় না। ভোটার রেজিস্ট্রেশন করতেও তাদের অনীহা। কেন তারা এমন মানসিকতার তার কারণ সমাজবিজ্ঞানীরা ভালো বলতে পারবেন। ভোট দেওয়ার কষ্টটুকুও তারা করতে চায় না। ভোটের ব্যাপারে জনগণ অনেকটাই নির্বিকার থাকে। তাই তাদের উদ্দীপিত করতে নানা পথ খুঁজে বেড়ান রাজনীতিকরা। সরকারি অফিসগুলোতে আগত লোকদের উৎসাহিত করার ব্যবস্থাও থাকে। কেউ যদি ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে বা রিনিউ করতে যায়, সেই ফরমের ভেতরেও আছে রেজিস্ট্রেশন করার একটি ছক। আর সেই ছক পূরণ করে দিলেই অতি সহজে সেই ব্যক্তি ভোটার হতে পারে। তবে তাকে অবশ্যই সঠিক তথ্য দিতে হবে। না হলে ভোটার তো হতে পারবেই না, এমনকি লাইসেন্সও হবে না। আর ড্রাইভিং লাইসেন্স হচ্ছে আমেরিকায় প্রধান পরিচয়পত্র। এই পরিচয়পত্রের গুরুত্ব অনেক বেশি, অন্য আইডির চেয়ে। ডিপার্টমেন্ট অব মোটর ভেহিকলস (ডিএমভি) থেকে নেওয়া আইডির পাশাপাশি সিটি প্রশাসনও আইডি দেয় নিউ ইয়র্কে, যদি আপনি সেটা নিতে চান। তো, এভাবে ভোটারদের নিবন্ধিতকরণের একটাই উদ্দেশ্য, তা হলো যোগ্যরা ভোটার হোক এবং ভোট প্রয়োগ করুক তাদের পছন্দের প্রার্থীকে। মিশেলের বক্তৃতায় কালো মানুষের প্রতি বিশেষ টান ছিল। তিনি বোঝাচ্ছিলেন, তারা কেন পিছিয়ে আছে। সে রকম বক্তৃতা আমি বারাক ওবামার ভার্জিনিয়ার মোরকলেজে দেওয়া সমাবর্তন বক্তৃতায়ও শুনেছি (২০১৩ সালে)। শুধু বারাক ওবামা বা মিশেল ওবামা নন, আমেরিকার রাজনীতিকরা এটা করেন ভোটার বাড়ানোর জন্য। নিজেদের দলের নাম নেন না। কিন্তু যারা উদ্দীপিত হয় তারা তাঁকে ভোলে না, দলের কথাও তারা বিবেচনায় রাখে।

আমেরিকায় উচ্চপর্যায়ে নানা রকম দলবাজি হয় বড় বড় ব্যাবসায়িক বিষয়ে, এমনকি দুর্নীতিও হয়; কিন্তু জনগণকে ফাঁকি দেওয়াটা খুব সহজ হয় না। তৃণমূল পর্যায়ে কোনো রকম দলীয় লেনদেন হয় না সরকারি অর্থের, যা বাংলাদেশে দেখা যায়। দলীয় লোকদের পোষণ করা বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাজের অংশ হয়েছে বহুকাল হলো। ফলে তারা দলীয় মিছিল-মিটিং করে, স্লোগান দেয় দলীয় নেতা-নেত্রীদের চৌদ্দ পুরুষের নামোল্লেখ করে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের মৌলিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে দলীয় কূপে নিক্ষেপ করে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও শাসকগোষ্ঠীর বশংবদ হয়ে পড়েন জনগণের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। এ রকমটা আমেরিকায় হওয়া সম্ভব নয়। কারণ এখানকার রাজনীতিকরা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের সদস্য হলেও যে দলীয় সংসদ সদস্যই হোক না কেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের মত তিনি বা তাঁরা তুলে ধরেন, দলীয় নীতিকে প্রাধান্য দেন না। জনগণের স্বার্থহানি হতে পারে বিবেচনা করে তাঁরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে মত প্রকাশ করেন বা ভোট দেন। তাতে দল তাঁকে খারিজ করে না, এমন কী তাঁর দলীয় সদস্য পদও খারিজ হয়ে যায় না। একই চেতনাধারা সিনেটেও বহমান। দলীয় ইচ্ছা নয়, জনগণের স্বার্থটাই বড় করে দেখেন তাঁরা। এই বড় করে দেখার আদর্শ তাঁরা নিয়েছিলেন এই ভেবে যে তাঁরাও জনগণেরই অংশ।

 দেশের সাবেক প্রেসিডেন্টরা কিংবা সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা কেন ভোটার হতে উৎসাহ জোগাচ্ছেন? কারণ একটাই—ভোটাররাই সব ক্ষমতার উৎস। তারাই উল্টে দিতে পারে ক্ষমতার মসনদ। তিনজন সাবেক রাষ্ট্রপতি আর কোনো দিন নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। তার পরও কেন সময় করে এই কাজ করছেন? কারণ উত্তরাধিকারের ঋণ পরিশোধ করা। তাঁরা দলীয় অগ্রজদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবদান ভোগ করেছেন। তাঁরা উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বলেই তাঁরা ভোটে নির্বাচিত হতে পেরেছিলেন। আর বাংলাদেশে ঠিক যেন উল্টোটা ঘটে। ভোটাররা যাতে ভোটার না হতে পারে, সে জন্য নানা রকম জটিলতা করে নির্বাচন কমিশন।

সবচেয়ে করুণ অবস্থা নির্বাচন কমিশনের। তাদের নির্বাচনী লোকবল নেই বললেই চলে। প্রশাসন থেকে ধার করা আমলা শ্রেণি দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন করে। ফলে সরকারি কর্মকর্তারা বহমান লিগেসি অনুযায়ী ক্ষমতাসীনদের বিজয়ী করতে চায়। কারণ তারা সরাসরি বর্তমান সরকারের কর্মকর্তা। চাকরির ক্ষেত্রে ক্যারিয়ারের ক্ষতি হতে পারে ভেবে সেই ডিসিরা সরকারের ইচ্ছা পূরণ করে থাকেন।

আমেরিকায় নানা রকম জরিপ হয় প্রতিনিয়তই। তারা কোনো দলীয় সংস্থা নয়। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করে। সেসব জরিপে দেখা যায়, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে গেছে। তিনি কতবার মিথ্যা বলেছেন, অনবরত মিথ্যা বলে চলেছেন ইত্যাদি জরিপে উঠে আসছে। এসব জরিপ জনমতের ওপর প্রভাব ফেলে। ভোটার জনগণ তখন সিদ্ধান্ত নেয় তারা কী করবে। বাংলাদেশে এমনটা করতে পারলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসত। এই সরকার প্রকৃত প্রস্তাবে কতটা উন্নয়ন করেছে, তার কত অংশ জনগণের কাজে লাগে, লাগবে, কতটা সুবিধা পাবে জনগণ, সেটাও বেরিয়ে আসত।

আমেরিকায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয় শিল্প ও কৃষি খাতকে। কৃষি খাতের যাবতীয় উন্নয়নের যা প্রয়োজন, সেটা সব কিছুর আগে নেওয়া হয়। আমাদের দেশেও কৃষি অগ্রাধিকার খাত; কিন্তু তার সঠিক বাস্তবায়ন নেই বলেই আজও আমাদের খাদ্যঘাটতি থাকে। সরকারের রাজনৈতিক চরিত্র হচ্ছে জবাবদিহি না করা। তিনি বা তারা সিংহাসনে আসীন, তাঁকে বা তাঁর কাছে জবাব চাওয়াটাও ধৃষ্টতা বিবেচিত হবে আমাদের রাজনীতিকদের কাছে। দয়া করে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসুন মাননীয় রাজনৈতিক সমাজ। না হলে জনগণের সমূহ বিপদ, আপনাদেরও।

লেখক : কবি, সাংবাদিক, নিউ ইয়র্ক প্রবাসী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here