১৬ জনের ফাঁসির রায় বনাম নুসরাত হত্যাকাণ্ড

64
নূরুল আলম আবিরঃ ফেনীর আলোচিত নাম নুসরাত জাহান রাফি। ফেনীর ফুলগাজী মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষার্থী ছিল দুঃসাহসী সত্য বলা মেয়েটি। বাবা মায়ের অতি আদরের কলিজার টুকরো মেয়ে নুসরাত। জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে গিয়েছিল শিক্ষালয়ে। কিন্তু পঁচন ধরা এ সমাজের বাস্তবতা তাকে সে সুযোগ দিল না। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো— যে মাদ্রাসায় সে লেখাপড়া শিখছিল চমৎকার একটি স্বপ্ন হৃদয়ে লালন করে। সেই মাদ্রাসারই অধ্যক্ষ লোলুপ দৃষ্টি দিল তার দিকে। যে মেয়েটির মনের ক্যানভাসে যৌনতা এখনো পুরোপুরি উপলব্ধির বাইরে, সে মেয়েটিকেই ধর্ষণ করতে মরিয়া হয়ে উঠল মানুষরূপী পাষণ্ড অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা।
তার খাস কামরায় তারই মাদ্রাসার পছন্দের মেয়েদের ডেকে পাঠায় সে প্রতিনিয়ত। বহু মেয়েই তার লালসার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছে। একের এক ধর্ষণের শিকার হতে যাওয়া নারীর তালিকায় যোগ হলো নুসরাতের নামও! সিরাজ উদ দৌলার খাস কামরায় একদিন ডাক পড়লো তারও। কোমল মনের নিষ্পাপ মেয়েটি তো হতবাক! সে ভেবে কূল পাচ্ছে না— কিভাবে নিজেকে রক্ষা করবে.? এমন হৃদয় তোলপাড় করা আতংকভরা গহীন সমুদ্র সাঁতার কেটে রওয়ানা হলো অধ্যক্ষের কক্ষে। ভয়ংকর প্রতাপশালী শয়তান অধ্যক্ষকে মোকাবেলা করা তার জন্য অসম্ভব হলেও সে মনে মনে হয়ত সেদিন পণ করেছিল— কোনো অন্যায় সে মানবে না।
অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করতেই দরজা বন্ধ করা হলো। লম্পট অধ্যক্ষ বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর প্রশ্ন ও মন্তব্য করতে শুরু লাগলো। কথাবার্তার এক পর্যায়ে ফুলের মত নিষ্পাপ মেয়েটির গায়ে হাত দিল ধর্ষক অধ্যক্ষ। অন্যায়ের সাথে আপোষ না করা মেয়ে এমন ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ছুটে এলো কক্ষ থেকে। চরম দুঃসাহস নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করে মামলা ঠুকে দিল। নুসরাতের এমন শ্লীলতাহানির ভয়ংকর অভিযোগ এনে গত ২৭ মার্চ আদালতে মামলা করে তার মা। ২৮ মার্চ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এএসএম এমরানের আদালতে নুসরাত তার ওপর যৌন নিপীড়নের জবানবন্দি প্রদান করে। একই দিন সোনাগাজী থানা পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে। শুরু হলো— প্রবল প্রতাপশালী একদল শয়তানের সাথে ক্ষুদ্রকায় ও অতি নিষ্পাপ সত্যবাদী মেয়ের জীবন-মরণের লড়াই। নিজের রাজ সম্ভ্রমের উপর এমন নগ্ন হামলা কোনোভাবেই মানতে পারছিল না মেয়েটি। তাই হয়ত তার পণ ছিল— জীবন দিয়ে হলেও একদল নরপশুকে হারিয়ে দিতে হবে। তাই কোনোরূপ আপোষ না করে লড়াই চালিয়ে গেল অসীম দুঃসাহসী সত্য বলা মেয়ে নুসরাত জাহান রাফি।
এদিকে থানায় অভিযোগ করার পর জিজ্ঞাসাবাদের নামে থানায় ডাকা হলো নুসরাতকে। সংশ্লিষ্ট থানার অসি মোয়াজ্জেম হোসেন এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতেও নুসরাতকে আপত্তিকর সব প্রশ্ন করতে লাগলো। ন্যায় ও ইনসাফ যারা প্রতিষ্ঠা করবে তাদের একজন সেনানায়ক হয়ে সোনাগাজী থানার অসি সেদিন সকল নিয়ম ও নৈতিকতাকে তোয়াক্কা না করে, সেও সেদিন ধর্ষণ মহাযজ্ঞে নিজেকে চমৎকারভাবে শামিল করলেন। মেয়েটার সাথে চরম নিষ্ঠুর ও ভয়ানক আচরণ করে, অসিও সেদিন প্রকারান্তরে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার ধর্ষণকান্ডকে সমর্থন করে গেল। সে দৃশ্য ইন্টারনেটের ভিডিওতে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলো, সারাবিশ্বের হতবাক হওয়া অগণিত অজস্র মানুষ।
মামলায় গ্রেফতার করা হলো অধ্যক্ষ সিরাজকে। এমন ঘটনায় প্রবলভাবে ক্ষিপ্ত হয় শয়তান ও পাষণ্ড অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা। তাই সে জেলে থেকেই নুসরাতকে হত্যার নীল নকশা প্রণয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ধর্ষক ও ভয়ংকর নিষ্ঠুর লোকটি একদল খুনী নিযুক্ত করে নুসরাতকে হত্যা করতে। তারই ধারাবাহিকতায় আলিম পরীক্ষা চলাকালীন নুসরাত মাদ্রাসায় যায় পরীক্ষা দিতে। আগে থেকে নিঁখুত নিশানায় থাকা নুসরাত জানে না, আজই তাকে হত্যা করা হবে। তার হত্যার ঘটনায় আঁতকে উঠবে সারাবিশ্ব। হতবাক হবে প্রতিটি মানবিক হৃদয়!
গত ৬ অপ্রিল পরীক্ষার হলে বসে পরীক্ষার চিন্তায় মগ্ন নুসরাত। জ্ঞানের পবিত্র মহামূল্যবান আলো আহরণ করতে ব্যস্ত কোমল হৃদয় অন্য কিছু কি আর ভাবতে পারে.! নুসরাতও তাই অন্য কিছু ভাবতে পারে নি। পরীক্ষার চিন্তায় বিভোর হওয়া সবার প্রিয় নুসরাতের পরীক্ষা কয়েক মুহূর্ত পরই আরম্ভ হতে যাচ্ছিল। ঠিক এমন সময় নুসরাতের ডাক পড়ল ছাদে যাওয়ার। পূর্ব পশ্চিম না ভেবে সহজ সরল মেয়েটি ছাদে চলে গেল। সেতো আর জানে না, তার জন্য একদল খুনী অপেক্ষা করছে। তার কোমল স্নিগ্ধ সুন্দর দেহখানি পুঁড়িয়ে ছাঁই করে দিতে ওরা সব আয়োজনই করে রেখেছে।
নুসারাত খুনীদের আহবানে সাড়া দিয়ে ছাদে গেল। যাওয়ার সাথে সাথেই তাকে পাকড়াও করা হলো। তারপর তার বুকে জড়ানো উড়নাটা কেড়ে নিল ওরা। সেটিকে সমান দুইভাগে ভাগ করে, এক ভাগ দিয়ে নুসরাতের দুই হাত আর বাকী অংশ দিয়ে নুসরাতের দুই পা বাঁধা হলো। এরপরই নুসরাতকে শুইয়ে দিয়ে তারা সারাদেহে কেরোসিন ঢেলে দেয়া হলো! তারপরই এমন চমৎকার সুন্দর ও নিষ্পাপ মেয়েটিকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিতে ঝলসে উঠল ম্যাচের কাঠি। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন দেয়া হলো জ্ঞানের জন্য বিরামহীন পিপাসার্ত নিষ্পাপ মেয়ে নুসরাতের গায়ে। নুসরাতের দেহের সাথে খুনীদের এমন ভয়ংকর আগুন পুঁড়িয়ে দিচ্ছিল বিশ্ব মানবতাকেও! সে সময় হেরে যাচ্ছিল সারা পৃথিবীর সকল ইনসাফ। আর্তনাদ করে উঠল প্রতিটি মানবিক হৃদয়।
তারপর আর কি! প্রায় ১০০% পুঁড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে মেয়েটা মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। আগুনে পুড়ছে পুড়তে যখন নুসরাতের দুই হাত ও পায়ের বাঁধনও পুঁড়ে গেল তখন মরিয়া হয়ে বাঁচতে চাওয়া হতভাগ্য মেয়েটি আগুনসহ নিচে গড়িয়ে পড়ল সিঁড়ি দিয়ে। নিচে থাকা একজন পুলিশ অফিসার যখন তার আগুন নেভাল, তখন নুসরাতের জ্ঞান নেই। অচেতন হয়ে বড্ড অভিমান করে এক পৃথিবী বিস্ময় নিয়ে জ্ঞান হারালো ফেনীর হীরক কন্যা নুসরাত জাহান রাফি। তারপর অচেতন অবস্থায়ই তাকে ফেনী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। সেখানে অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হলো। জ্ঞান ফিরে পেয়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় কতশতবার যে মেয়েটি সেদিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে, তার হিসাব করা কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। এভাবে জ্ঞান ফিরে পাওয়ার কিছুক্ষণ পর পরই নুসরাত জ্ঞান হারাচ্ছিল। প্রতি মুহুর্তেই সে যেন যমদূতের সাক্ষাত পাচ্ছিল। যমদূত যেন বারবার এসে তাকে বলে যাচ্ছিল— নুসরাত তোমাকে আর বেশিক্ষণ কষ্ট করতে হবে না। এইতো আর কয়েকটা মুহূর্ত পর তোমার প্রাণবায়ুটা বের করে উড়াল দেব অসীমের পানে। এভাবে প্রতি মুহুর্তে মৃত্যুর সুকঠিন ও অতি নিষ্ঠুর যন্ত্রণা ভোগ করতে করতেই— ১০ এপ্রিল পরপারে পাড়ি জমাল আমাদের সবার প্রিয় নুসরাত জাহান রাফি।
নুসরাত চলে গেছে পৃথিবী ছেড়ে। আমরা তাকে বাঁচাতে পারিনি। আমাদের সকল প্রচেষ্টাকে মিথ্যা প্রমাণ করে, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল নুসরাত। পুলিশের বিশেষ বিভাগ পিবিআই তদন্তভার গ্রহণ করার পর খুনীরা একের পর এক ধরা পড়তে থাকে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুনীরা যেন কোনোভাবেই ছাড় না পায়, সেজন্য শেখ হাসিনার সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়ে এ হত্যা মামলা পর্যবেক্ষণ করলো। একে একে গ্রেফতার হওয়া ১৬ জন খুনীরই সর্বোচ্চ সাজা হলো। তাদের সবাইকে দেয়া হলো মৃত্যুদণ্ডের আদেশ। বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর, ২০১৯) বেলা সোয়া ১১টার দিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ রায় দেন। নিম্ন আদালতে ফাঁসির রায় হলেও বাকি রয়েছে উচ্চ আদালতের রায়। প্রতিটি মানবিক ও সচেতন নাগরিকদের আকুল প্রত্যাশা— সে রায়েও যেন খুনীদের সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকে। একজন নুসরাতের জীবন শত সহস্র খুনীর ফাঁসি কার্যকরে ফিরে না হলেও প্রমাণ হোক দেশে আইন আছে, বিচার আছে। অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হবে— এ বার্তা পৌঁছে যাক প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের গহীনে। এমনটি করা সম্ভব হলেই কেবল প্রতিষ্ঠিত হবে— একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ, একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ।
লেখকঃ
কবি, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
২৭ অক্টোবর ২০১৯ ইং