স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বসবাসরত লক্ষাধিক চা শ্রমিকরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে

49
কে এস এম আরিফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার ::

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বসবাসরত লক্ষাধিক চা শ্রমিকরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। চা বাগানের আধপাকা কলোনি গুলোয় গাদাগাদিভাবে বসবাস করে শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা। পুষ্টিকর খাবারও শ্রমিকরা পাচ্ছেনা ঠিকমত। ভালো মানের পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখনও খোলা ও উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করেন।

সেই সাথে রয়েছে সুপেয় পানীয় জলেরও সমস্যা। পরিচ্ছন্ন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব, মাদকাসক্তি, অপুষ্টি, নালা ও খালের পানির ব্যবহারে ডায়রিয়াসহ অপুষ্টির শিকার হচ্ছে শ্রমিকরা ৷ নাজুক এই পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে শ্রমিকরা। উপজেলার চা বাগান এলাকা ঘুরে শ্রমিকদের কাছ থেকে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অধিকাংশ চা শ্রমিক পরিবারে একজনের দৈনিক ১০২ টাকা মজুরির ওপর নির্ভরশীল ৫-৮ সদস্যের লোক। ফলে খাবারে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টির অভাব। অপরদিকে মানসম্মত পয়:নিষ্কাশনের অভাবে কলাপাতা, পলিথিন ও বেড়া দিয়ে অথবা উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগসহ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই বেড়ে উঠছে চা শ্রমিক সন্তানরা।

পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসার অভাব, বাসস্থান ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের অপর্যাপ্ততার কারণে চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হয়নি। আর্থিক অস্বচ্ছলতা, ভূমির সমস্যা, লোকবল বৃদ্ধি ও কিছুটা অভ্যাসগত কারণেও চা বাগানের শ্রমিক কলোনি ও পরিবারসমূহের ৪৫-৫০ শতাংশ পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা খুবই নাজুক। বাগান কর্তৃপক্ষ, ইউনিয়ন পরিষদ ও এনজিওসমূহের মাধ্যমে কিছু ল্যাট্রিন বিতরণ করা হলেও বিশাল শ্রমিক পরিবারের জন্য সেগুলো পর্যাপ্ত নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চা শ্রমিক এই প্রতিবেদককে জানান, চা শ্রমিকদের পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা এখনও এখানে প্রধান সমস্যা। তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করা জরুরী। বাগানে চিকিৎসা ব্যবস্থাও নাজুক। অধিকাংশ রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা হয় প্যারাসিটামলের মাধ্যমে, তাছাড়া বাগানের শ্রমিকরাও হাসপাতালে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। বাগানে বেশিরভাগ মানুষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে। নালা কিংবা চা বাগানের মধ্যে মলমূত্র ত্যাগের অভ্যাস তাদের সামগ্রিক পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকর করে তোলে। তবে সব বাগানে একই অবস্থা নয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বালিশিরা ভ্যালি সভাপতি বিজয় হাজরা সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম-কে জানান, সরকার, মালিক ও শ্রমিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চা শ্রমিকদের জীবনমানে পরিবর্তন আনতে হবে। বাগানগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা, অশিক্ষা, অসচেতনতা, কুসংস্কার ও দারিদ্র্য এই সমস্যাগুলো প্রকট। পরিচ্ছন্ন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব, মাদকাসক্তি, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাবার না খাওয়ানো, নালা ও খালের পানির ব্যবহার ইত্যাদি কারণে পানিবাহিত ডায়রিয়াসহ অপুষ্টির শিকার হয় শিশুরা। চা শ্রমিকদের ৮০ শতাংশ নিরক্ষর, ৫০ শতাংশ উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করে আর ৩৫ শতাংশের স্যানিটেশন সুবিধা আছে বলে বিভিন্ন গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনাকালে চিত্রটি উঠে আসে।

ভাড়াউড়া চা বাগানের হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে গত একমাসে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিক এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুইজন শ্রমিক মারাও গেছেন৷ এছাড়া ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানেও শতাধিক শ্রমিক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন গত কয়েক দিনে, তাদের মধ্যেও একজনের মৃত্যু হয়েছে৷

চা শ্রমিক সুনীল মৃধা জানান, বাগানের বেশিরভাগ মানুষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করছে। অবহেলিত থাকায় এখনও আমাদের নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের পুরোপুরি সুবিধা পাওয়া সম্ভব হয়নি।

খেজুড়ীছড়া চা বাগানের শ্রমিক সীতা রাণী জানান, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে কাজ করলেও আমাদের কর্মস্থলে ল্যাট্রিন ও বাথরুম নেই। চা বাগানে কাজ চলাকালীনও আমাদের টিলা কিংবা চা গাছের আড়ালে উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করতে হয়।
মৌলভীবাজার চা শ্রমিক সংঘের নেতা শ্যামল অলমিক জানান, এখনও চা বাগানের ৫০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাস্থ্যসম্মত পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। এরা খোলা জায়গায় আনাচে-কানাচে মলমূত্র ত্যাগ করে। শ্রম আইন, সংবিধান, ইউনিয়ন পরিষদসহ সকল আইনে পয়:নিষ্কাশন নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে চা বাগানে রয়েছে এর ভিন্ন চিত্র।

মাজদিহী বাগানের শ্রমিক দেওরাজ রবিদাস, ফুলন্তি রবিদাস; জাগছড়া বাগানের ছোটুয়া বৈদ্য; ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানের স্বপন মৃধা, মিরা রিকিয়াশন;  চা বাগানের ষোলরাম কর্মকার, গীতা রবিদাস, দীনেশ র‌্যালী প্রমুখ জানান, ১০২ টাকা মজুরিতে পরিবারের সদস্যদের তিন বেলা খাবার চালানোই সম্ভব হয় না। টাকার অভাব ও জায়গা সংকুলানের কারণে ল্যাট্রিন বানাই কিভাবে? তাই বাধ্য হয়েই খোলা স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করতে হয়। শত শত পরিবারের মধ্যে বাগান মালিক প্রতিবছর মাত্র পাঁচ থেকে দশটি পরিবারে ল্যাট্রিন দিচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফিনলে চা কোম্পানির ডিজিএম জি এম শিবলী সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম কে জানান, “আসলে চা শ্রমিকদের মধ্যে এখনও কুসংস্কার রয়ে গেছে, একই টয়লেটে শ্বশুর ও ছেলের বউ যায় না৷ তাই অনেকেই শৌচকর্মটি বাইরে করেন৷ তবে আমাদের বাগান কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি৷ অনেকগুলো গভীর ও অগভীর নলকুপ স্থাপন করা হয়েছে সুপেয় পানির অভাব দুরীকরনের জন্য তাছাড়া আমরা পর্যায়ক্রমে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটও বানিয়ে দিচ্ছি কোম্পানীর খরচে৷”

শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিন টিটো জানান, “আসলে চা শ্রমিকদের মূল যে অভাবটি সেটি হচ্ছে সুপেয় পানির অভাব৷ তাদের পয়নিস্কাশনের ব্যবস্থাও ভালো না,ছড়ার পানি ব্যবহারের ফলে তাদের নানান সমস্যা হচ্ছে ৷

তিনি আরও বলেন, সমস্যা উত্তরনে আমরা চা শ্রমিকদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা দিচ্ছি,কেউ আক্রান্ত হওয়া মাত্রই আমরা যত দ্রুত সম্ভব আমরা তাদেরকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসছি৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here