নুসরাত জাহান রাফি পাস করতে পারল না

166
নূরুল আলম আবিরঃ নুসরাত জাহান রাফি পাস করতে পারল না। পাস করবে কিভাবে? মেয়েটি পরীক্ষাই তো দিতে পারল না। প্রবল মানসিক চাপ নিয়ে ২ বিষয় পরীক্ষা দিতে পেরেছে, ফেনীর সত্য বলা মেয়ে নুসরাত জাহান রাফি। এ সত্য বলার অপরাধেই ধর্ষক সিরাজ উদ্ দৌলার লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসীরা তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরীক্ষার হলে যেখানে শিক্ষার্থীকে পুড়িয়ে মারা হয় সে হলে দুই বিষয় পরীক্ষা দিয়ে “এ গ্রেড” পেয়েছে সারা বাংলার অহংকার, দুঃসাহসী সত্যবাদী ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা বঙ্গ ললনা নুসরাত জাহান রাফি। নুসরাতের মা বলল, আমার মেয়ে দুনিয়ার পরীক্ষায় ফেল করলেও আখেরাতের পরীক্ষায় ঠিকই পাস করবে। এইচএসসি’র ফলাফল ঘোষণার পর বিরামহীন বুক ভাসানো কান্নায় দিশাহীন ও হতভাগ্য এ মা আশা করেছিল তার খুকুমণি নুসরাতও সবার সাথে পাস করবে। তা আর হলো কই? ঘাতকের নিষ্ঠুর অনলে মেয়ের সাথে তার চমৎকার ও রোমাঞ্চকর স্বপ্নটিও পুড়ে ছাঁই হয়ে গেল।
নুসরাত আলিম পরিক্ষার্থী ছিল। ফলাফল বিবরণীতে দেখা যায়, প্রথম পরীক্ষা কোরআন মাজিদ (২০১) এবং হাদিস ও উসুলে হাদিস (২০২) পরীক্ষায় নুসরাত জাহান রাফি ‘এ’ গ্রেড পেয়েছে। বাকি পরীক্ষায় আর অংশ নিতে পারেনি সে। এ কারণে সব মিলিয়ে ‘অকৃতকার্য’ ফল আসে অশ্রু ঝরা মেয়ে নুসরাতের।
সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে এবার আলিম পরীক্ষায় নুসরাতসহ ১৭৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এদের মধ্যে ১৫২ জন পাস করেছে। নুসরাতসহ ফেল করেছে২৭ জন। এ মাদরাসায় এবার পাসের হার ৮৬.৮৬ শতাংশ। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নুসরাতের সহপাঠী ও স্বজনরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। বুধবার পরীক্ষার ফল জানতে মাদরাসায় আসা সহশিক্ষার্থীরা নুসরাতের জন্য কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় উপস্থিত শিক্ষকদের চোখেও দেখা যায় অশ্রুর বান। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
এদিকে গতকাল বুধবার আলিম পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই কান্না থামছে না নুসরাতের স্বজনদের। নুসরাতের দুখিনী মা শিরিনা আক্তারের বিলাপ যেন থামতেই চায় না। শিরিনা আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়ে দুনিয়ার পরীক্ষায় পাস করতে না পারলেও আখিরাতের পরীক্ষায় পাস করবে।’
নুসরাতের ভাই মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে নুসরাতের পরীক্ষার ফল বের করেন। বাড়িতে গিয়ে বোনের পরীক্ষার ফলের কথা জানান মাকে। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন নোমানও। বলেন, ‘আমার বোন যদি ভালোভাবে পরীক্ষা দিতে পারতো তাহলে ভালো ফলাফল অর্জন করতো।
উল্লেখ্য, নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিল। ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ সিরাজ উদ্ দৌলার  বিরুদ্ধে সে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করে। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এরপর সে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়। গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে কৌশলে পাশের বহুতল ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায় খুনীরা। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়া হয়।  এরপর ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যায়। অশ্রুতে ভাসে সারাদেশ। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল ৮জনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।