আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের অধীনে ‘জমি আছে ঘর নেই’ ঘর নির্মাণে দূর্নীতি

375

হুমায়ুন কবির সুমন: সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অর্থে আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের অধীনে ‘জমি আছে ঘর নেই’ প্রকল্পে ২১৬টি ঘর নির্মানে সাবেক ইউএনও বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ‘স্থানীয় সরকার’ বিভাগের উপ-পরিচালকের (ডিডিএলজি) বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প পরিচালক বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে ঘর নির্মান না হওয়ায় বিপাকে অসহায় মানুষগুলো। এমন দূর্নীতি কোন ভাবেই মেনে নিতে পাছেন না জন প্রতিনিধিরা।

যমুনা নদীর করাল গ্রাসে ছিন্ন ভিন্ন কাজিপুর উপজেলার অসহায় মানুষদের একটু মাথা গোজার ঠাই করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের অধীনে ‘জমি আছে ঘর নেই’ প্রকল্পে ২১৬টি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতিটি ঘরের জন্য এক লাখ ১৯ হাজার টাকা হিসেবে ২ কোটি সাতান্ন লাখ চার হাজার টাকার প্রকল্প’র কাজে সুফল পায়নি সুবিধাভোগিরা। সে সময় দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিকুল ইসলাম নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজেই ঘর গুলো নির্মান করার জন্য উদ্যোগ নেন। তিনি প্রকল্পের সভাপতি আর উপজেলা বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সদস্য সচিব ও কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে সদস্য করে ঘর নির্মানের কাজ শুরু করেন। নিম্ন মানের কাঠ টিন আর ইট সিমেন্ট দিয়ে কিছু ঘর নির্মান করলেও তালিকায় ঘর পাওয়া বেশ কয়েকজনের বাড়িতে কোনো প্রকার কাজ করেনি। উপজেলার ঝুমকাইল হিন্দুপাড়া গ্রামের সুনিল চন্দ্র দাস (ইউনিয়ন চকিদার) এবং বীর শুভগাছা গ্রামের রোকেয়া বেগম জানান ঘর পাওয়ার তালিকায় আমাদের নাম থাকলেও বাস্তবে আমরা ঘর পাইনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘরের খুটি লাগিয়ে মিস্ত্রি ও কাঠ ব্যবসায়ীদের বিল বকেয়া রেখেই ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সব টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যান তিনি। এর পর শফিকুল ইসলাম এই জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে যোগদান করেন। স্থানীয় ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন ভাবে তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ঘর নির্মান করে দেবে বলে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন। পরে উপজেলার সব ইউপি চেয়ারম্যানগন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রকল্প পরিচালক সহ বিভিন্ন জায়গায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। ‘কাকে ঘর দেয়া হয়েছে’ তা উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা জানেন না বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালিন ইউএনও শফিকুল ইসলাম চেয়াম্যানদের হুমকি ধামকি দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে প্রকল্প পরিচালক বিষয়টি তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসককে দায়িত্ব দেন। জেলা প্রশাসক জেলা পরিষদের সচিবকে দায়িত্ব দিলে তিনি একদিন মাঠে তদন্ত করে আসলে পরের দিন পদন্নোতি হয়ে লালমনিরহাট চলে যান। এরপর আর কাউকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়নি। এদিকে বৃষ্টি আর প্রচন্ড রোদে অসহায় গরিব মানুষগুলোর মাথা গোজার ঠাই না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। এদিকে গান্দাইল খামারপাড়া গ্রামের শহিদুল ইসলাম জানান,আমার নামে ঘর বরাদ্দ থাকলেও আমার বাড়িতে ঘর নির্মাণ করা হয়নি। ভূক্তভোগি আশরাফ আলী জানান, গত ছয় মাস আগে ঘড় তৈরি করার জন্য খুটি পুতে গেছে, এখনো পর্যন্ত ঘড় তৈরী হযনি। একটি ঘর পেলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো। আরেক ভুক্তভোগী আবুল কাসেম জানান, গত আট মাস আগে ঘর দেবার নাম করে নামে মাত্র খুটি আর ল্যাট্টিনের পাট রেখে চলে যায়। আজ অবধি তাদের আর দেখা মেলেনি।

এদিকে পাওনা টাকার জন্য স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালকের কাছে গেলে দূর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেয় বলে জানালেন কাঠ মিস্ত্রি আর কাঠ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ১৬ লক্ষ টাকার মধ্যে আট লক্ষ টাকা দিলেও বাকি টাকা এখনো পাইনি। তাছাড়া আমার কাছ থেকে কেনা কাঠেরও সন্ধান মিলছে না। আরেক ঘরমিস্ত্রী সোরহাব আলী জানান, কাজের পাওনা ১৫ লাক্ষ টাকা এখনো পাইনি। নিজের জমি, বন্ধক রেখে ও গরু বিক্রি করে শ্রমিকদের টাকা পরিশোধ করেছি। এখন দিন পাত চালানো আমার কক্টসাধ্য হয়েছে।

কাজিপুর উপজেলার ৬ নং মাইঝবাড়ি ইউপি চেয়াম্যান ও উপজেলা চেম্যারম্যান সমিতির সভাপতি শওকত হোসেন জানান, আমার ইউনিয়নে ১৭টি ঘর বরাদ্দ থাকলেও পাঁচটি ঘর হয়েছে। দুটি ঘর নাম মাত্র আছে। বাকি ঘর গুলোর কোন নাম হদিস নেই। তিনি আরো জানান, প্রকল্পে ইউপি চেয়ারম্যানদের সংশ্লিষ্টতা থাকার বিধান থাকলেও সাবেক ইউএনও প্রভাব খাঁটিয়ে আমাদের দূরে রেখেছিলেন। ২নং চালতাডাঙ্গা ইউনিয়নের ইউপি চেয়াম্যান আতিকুর রহমান মুকুল জানান, এসব বিষয়ে ইউএনও মহোদয়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি হুমকি ধামকি দিতেন। আমার এখানে ১১ টি ঘর বানানোর কথা থাকলেও নিম্ন মানের নয়টি ঘর করা হয়। আর বাকিগুলোর শুধু খুটি আছে ঘর নেই।

কাজিপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এ কে এম শাহ আলম মোল্লা জানান, আমি সদস্য সচিব কি না তা জানিনা। তবে এ ব্যাপারে আমি কোন কথা বলতে পারবো না। বিষয়টি জানতে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালকের কার্যালয়ে বার বার গেলেও তার দেখা মেলেনি। এমনকি তার ব্যবহৃত ০১৭১৮-২৮৮২৪৯ নং মুঠো ফোন করলে রিসিভ করেও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কথা বলতে রাজি হননি সাবেক ইউএনও ও বর্তমানে জেলার স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক শফিকুল ইসলাম।

সিরাজগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ ফিরোজ মাহমুদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে একটি চিঠি এসেছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য একজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। এখন নতুন কাউকে আবার দায়িত্ব দেয়া হবে। তদন্তের পর ব্যবস্থা নেয়া হবে।