পুরান ঢাকার কোটিপতি স্থায়ী বাসিন্দা এখন বৃদ্ধাশ্রমে!

429

ডেস্ক রিপোর্ট: ছেলে মেয়ে পাশে না থাকলেও পাশে আছে পারি ফাউন্ডেশন এবং চাইল্ড এন্ড ওল্ড এজ কেয়ার হোম। পড়তে পারেন এক অসহায় বৃদ্ধ বাবার করুন জীবন কাহিনী। আড়াই কোটি টাকা দামের বাড়ি বিক্রি করেও ছেলে বাবাকে রেখে যায় রেলস্টেশনে। কিন্তু ‘পারি ফাউন্ডেশন’ স্বযত্নে বুকে টেনে নিয়েছেন অসহায় মিনু মিয়াকে।

পুরান ঢাকার ১৯/২ নারিন্দা এলাকার নিবাসী মিনু মিয়া। মিনু মিয়ার বয়স প্রায় ৭০ বছর, তারা পাঁচ ভাই, দুই বোন। তার মধ্যে মিনু মিয়া সবার বড়। মিনু মিয়ার বাবার ছিল দুই সংসার। প্রথম সংসারে মিনু মিয়া ছিলেন একা এবং দ্বিতীয় সংসারে মিনু মিয়ার সৎ চার ভাই ও দুই বোন। সৎ চার ভাইয়ের নাম মৃত সুলতান হোসেন, বেলায়েত হোসেন, আওলাদ হোসেন এবং মামুন হোসেন। তারা সবাই পুরান ঢাকার নারিন্দা এলাকার বাসিন্দা। সৎ ভাই-বোনসহ মিনু মিয়ারা থাকতো নিজস্ব পৈতৃক বাড়িতেই।

তিন বছর আগে মিনু মিয়া ও তার সৎ ভাইয়েরা মিলে ১৯/২ নারিন্দার পাঁচ তলা পৈতৃক বাড়িটি বিক্রি করে আড়াই কোটি টাকায়। মিনু মিয়া ভাগের যে টাকা পেয়েছিল তার সবটুকুই ছেলের ব্যবসার জন্য তুলে দেয় ছেলের হাতে।

বয়সের ভারে মিনু মিয়া অনেক সময় নিজের কাপড়েই প্রস্রাব-পায়খানা করে দিত। যত দিন মিনু মিয়ার টাকা ছিল ততদিন প্রসাবের গন্ধ নাকে লাগতো না মিনু মিয়ার একমাত্র আদরের সন্তান রানা মিয়ার। টাকা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মিনু মিয়ার শরীরের গন্ধটা আরো বেশী হতে লাগল ছেলে রানা মিয়ার কাছে। অযত্ন আর অবহেলায় চলতে থাকে মিনু মিয়ার কষ্টের জীবন।

গত জুন মাসের ২৪ তারিখে ছেলে রানা মিয়া তার বাবা মিনু মিয়াকে বেড়ানোর কথা বলে নিয়ে আসে এয়ারপোর্ট রেলস্টেশনে। প্রস্রাবের কথা বলে ছেলে রানা মিয়া তার বাবাকে একটি দোকানের পাশে বসিয়ে রেখে চলে যায়। ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে মিনু মিয়া, কিন্তু তার আদরের ছেলেতো আর আসে না! ঘন ঘন প্রস্রাব করে বিধায় কয়েকদিন আগে তার ছেলে তাকে রাগ করে বলেছিল তোমাকে আর ঘরেই রাখবো না, স্টেশনেই রেখে আসবো।

ছেলের সেই কথাটি বার বার বাজতে থাকে মিনু মিয়ার কানে, হঠাৎ সে ব্রেইন স্ট্রোক করে অজ্ঞান হয়ে যায়। ঢাকা শহরের রেলস্টেশনের বাস্তবতা বড় কঠিন! কে কাকে দেখে? কত সময় অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল মিনু মিয়ার তা মনে নেই। জ্ঞান ফেরার পর মিনু মিয়া বুঝতে পারে সে তার শরীরের বাম হাত ও পায়ে শক্তি পাচ্ছেন না। মিনু মিয়া তখন নিশ্চয়ই হয়তো মনে মনে ভাবছিলেন, জ্ঞান না ফেরাটাই তো ভাল ছিল!

প্রতি শুক্রবার এয়ারপোর্ট রেলস্টেশনে অসহায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য পারি ফাউন্ডেশন খাবারের আয়োজন করে থাকে। খাবার আয়োজন শেষ করে পারি’র সদস্যরা প্লাটফর্ম থেকে বের হওয়ার সময় মিনু মিয়াকে নজরে আসে। পারি’র সদস্যরা বুঝতে পারে, যে কোন দুর্ঘটনার শিকার হয়েই এই ভদ্রলোক রেলস্টেশনে পড়ে আছে। ক্ষুধায় এবং অসুস্থতায় সে কাঁপছিলো এবং ঠিকমত কথা বলতে পারছিলো না।

পারি’র সদস্যরা সাথে সাথেই মিনু মিয়াকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হসপিটালে ভর্তি করে। সিটিস্ক্যানসহ অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায় সে ব্রেইন স্ট্রোক করেছে এবং তার হার্টেও সমস্যা আছে। পারি’র সদস্যরা তাকে সেবা দিতে থাকে। দুই দিন পরেই সে একটু একটু কথা বলতে শুরু করে এবং তার কাছ থেকে আস্তে আস্তে ঠিকানাসহ বিভিন্ন তথ্য নেওয়া হয়।

পারি’র এক সদস্য তার ঠিকানামত গিয়ে তার ছেলের সন্ধান পায় এবং পরদিন তাকে হাসপাতালে আনা হয়। কিন্তু মনের কষ্টে মিনু মিয়া তার ছেলের মুখটাই দেখতে চায় না! ছেলে রানা মিয়া তার বাবাকে তার বাসায় না নিয়ে কোন এক বিদ্ধাশ্রমেই দিয়ে দিতে বলে পারি’র সদস্যদের। দীর্ঘদিন ধরে অসহায় মানুষ নিয়ে কাজ করা পারি’র সদস্যরা বুঝতে পারে তার ছেলে আর তার বাবাকে কখনো ঘরে নেবেনা এবং অসহায় মিনু মিয়াও ছেলের ঘরে যেতে চায় না ।

অবশেষে পারি’র সদস্যরা মিনু মিয়াকে ঢাকার কল্যাণপুর পাইক পাড়ায় অবস্থিত চাইল্ড এন্ড ওল্ড এইজ কেয়ার হোম নামক একটি বিদ্ধাশ্রমে ভর্তি করে দিয়ে আসেন।

নচিকেতার গানের সাথে মিনু মিয়া ও তার ছেলের পুরোপুরি মিল আছে। মিনু মিয়ার ছিল এক ছেলে ও এক মেয়ে, আবার ছেলে রানা মিয়ারও এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলের বয়স ১০ আর মেয়ের বয়স ৭। সর্বশেষ বাপ ছেলের মিলনটা মনে হয় বিদ্ধাশ্রমেই হবে। মিনু মিয়ার পাশের সিটটা ছেলে রানার জন্যই আমরা বরাদ্দ রাখলাম!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here