ফরিদপুর সোনালী ব্যাংকের সাবেক ডিজিএমের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত

61

বিপ্লব আহমেদ: ফরিদপুর সোনালী ব্যাংক প্রিন্সিপাল অফিসের সাবেক ডিজিএম নিরেন্দ্রনাথ দাসের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ফরিদপুর ও রাজবাড়ী শাখায় চাকরিকালীন তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে নিজে আর্থিকভাবে লাভবান হন। নিরেন্দ্রনাথ দাসের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাংকের কয়েক কর্মকর্তা ও গ্রাহক প্রধান কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন জানিয়েছেন। নিরেন্দ্রনাথ দাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান কার্যালয়ের একটি সূত্র। দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দেওয়ার পর সেই অভিযোগটি আমলে নিয়ে তা তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, নিরেন্দ্রনাথ দাস ফরিদপুরে চাকরিকরাকালীন বদলি বাণিজ্য করে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির কারণে মধুখালী ব্রাঞ্চ থেকে জনৈক ইদ্রিস আলী ফকিরকে তিনবার অন্যত্র বদলি করা হলে নিরেন্দ্রনাথ টাকার বিনিময়ে পুনরায় মধুখালীতে তাকে পোস্টিং দেন। দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে এক ব্যক্তিকে এক মাসে তিন জায়গায় বদলিরও নজির গড়েন নিরেন্দ্রনাথ, যা ব্যাংকের আইনে সম্পূর্ণ বেআইনি। একটি অটোরাইস মিলের ঋণের ফাইলটি অসঙ্গতি থাকায় পূর্বের ডিজিএম ফেরত পাঠালেও নিরেন্দ্রনাথ সেই রাইস মিলটিকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ৫ কোটি টাকার ঋণ পাইয়ে দেন। বর্তমানে রাইস মিলটি সচল নেই। কৃষি ঋণের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে রয়েছে কয়েকশ’ অভিযোগ। ঋণ দেওয়ার নাম করে ঋণ গ্রহিতাদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন। তাছাড়া ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে কয়েকশ’ ব্যক্তিকে অবৈধ উপায়ে ঋণ দিয়েছেন। যেটি তদন্ত করছে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। ব্যাংকের গাড়িটি তিনি তার ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি করেছেন। গাড়ি মেরামত বাবদ তিনি প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।

সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে বিশেষ নিরীক্ষা দল কর্তৃক তদন্ত রিপোর্টে নিরেন্দ্রনাথ দাসের সময়ে মধুখালী শাখার অকৃষকদের সংখ্যা ৪টি, যার টাকার পরিমাণ ৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং ভুয়া পর্চা দিয়ে ৬৪ জন, যার টাকার পরিমাণ ২৫ লাখ ৩৮ হাজার, একই পরিবারের ডাবল ঋণ দেয়া হয়েছে ৭ জনকে, যার টাকার পরিমাণ ৩ লাখ ১৫ হাজার, অনিয়মিত মোট ঋণ ৭৯টি, যার টাকার পরিমাণ ৩১ লাখ ৬৯ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। তিনি আর্থিক সুবিধা নিয়ে এসব ঋণ বিতরণ করেছেন।

এ বিষয়ে ব্যাংকের তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি এন্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট (সূত্র নং-এফআইসিএমডি৫০০৩ (ডি) ২০১৮/৪১১৭) তারিখ-১৭/১২/২০১৮) মোতাবেক ১১টি শাখা কৃষি ঋণের অনিয়মের অভিযোগটি যাচাই পূর্বক তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বলা হলেও তার কোন পদক্ষেপ নেয়নি নিরেন্দ্রনাথ। তিনি প্রতিটি শাখার ব্যবস্থাপক/কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে তদন্তের নামে ১৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। ফলে তিনি নামমাত্র তদন্ত করে অফিস অর্ডার করে দুর্নীতিবাজদের বাঁচিয়ে দেন।

এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মাঝে তোলপাড় চলছে। কানাইপুর শাখার অফিসার জহিরকে কর্মচারী গৃহ নির্মাণ ঋণের ৫৫ লাখ টাকা অবৈধভাবে ঋণ দিয়েছেন। জহিরের কাগজপত্র ভুয়া বলেও প্রতীয়মান হয়। ব্যাংক থেকে মোটা অংকের ঋণ নিলেও তিনি কোনও বাড়িই নির্মাণ করেননি। রাজবাড়ীতে চাকরিকালীন একই ভাবে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন নিরেন্দ্রনাথ সাহা।

এছাড়া বিভিন্ন শাখায় মাঠকর্মী কর্তৃক ভুয়া, বেনামী, অনিয়মিত, ব্যাংক বিধি বহির্ভূত কৃষি ঋণ বিতরণ কার্যক্রমের বিষয়ে আঞ্চলিক কার্যালয়ে একাধিক কর্মকর্তা কর্তৃক তদন্ত পূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণা না করে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সেই দুর্নীতিবাজদের স্বপদে বহাল রাখেন। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি এবং অনিয়মের মাধ্যমে নিরেন্দ্রনাথ ফরিদপুরে গৌর গোপাল আঙ্গিনার সামনে ৬তলা একটি বাড়ী, রাজবাড়ী শহরে তার স্ত্রী সন্তানদের নামে একাধিক পল্ট, গাজীপুরে তার নিজের নামে দুটি পল্ট রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমান সম্পত্তি রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় দেড় কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। নিরেন্দ্রনাথ দাসের বিরুদ্ধে দুদকে দেওয়া অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে নিরেন্দ্রনাথ দাস বলেন, আমার বিরুদ্ধে একটি পক্ষ মিথ্যা প্রচারণায় নেমেছে। দুদকসহ বিভিন্ন স্থানে যেসব অভিযোগ দেয়া হয়েছে সেগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট। সোনালী ব্যাংক ফরিদপুর জেনারেল ম্যানেজারের কার্যালয়ের জিএম আব্দুল আজিজ জানান, নিরেন্দ্রনাথ দাসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here