তৃতীয় শ্রেণী থেকে পান বিক্রি করে স্নাতক পাশ যে তরুণের

751
নূরুল আলম আবিরঃ কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলায় এক বিস্ময় বালক তৃতীয় শ্রেণী থেকে পান বিক্রি করে স্নাতক পাশ করেছে। শুধু কি তাই? তৃতীয় শ্রেণীতে থাকাকালীন এ ছোট্ট ছেলেটি পড়াশোনার পাশাপাশি বাবা-মা’র ভরণপোষণের সাথে সংসারের চাকাও সচল রেখেছে। সে সময় বাবার সংসারে ছিল বড্ড অভাব। ৮ ভাইয়ের সংসার টানতে বেশ বেগ পেতে হতো উপজেলার বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের গান্দাছি গ্রামের মোঃ সানাব উদ্দিনের পিতা ছবির আহমেদের। দু’বেলা দুমুঠো অন্ন জোগাড়ই যেখানে পরম কষ্টসাধ্য ব্যাপার, সেখানে আর সবার মত স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া শেখার স্বপ্ন তো অনেক দূরের ব্যাপার। সেই অনেক দূরের এবং অনেক বড় স্বপ্নটিও আজ পূরণ হলো সংগ্রামী জীবন যোদ্ধা মোঃ সানাব উদ্দিন ওরফে সাহাব উদ্দিনের। কারণ আজ সে স্নাতক পাশ করেছে। এখন মাস্টার্সে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে দারুণ লড়াকু এ তরুণ। নিজ গাঁয়ে প্রতিষ্ঠিত গান্দাছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াকালীন সানাব উদ্দিন শুরু করেন পান বিক্রি। সেখান থেকে সফলভাবে পাশ করেন পঞ্চম শ্রেণী।
তারপর বাঙ্গড্ডা বাদশা মিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে ভালো ফলাফল করে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেন মোঃ সানাব উদ্দিন। এরপর ভর্তি হন চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুন্সীরহাট প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান ডিগ্রী কলেজে। গত ২৮ এপ্রিল প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে এই কলেজ থেকেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিবিএস পাস (স্নাতক) ডিগ্রী অর্জন করে সে। সানাব উদ্দিন এখন ভর্তি হবে মাস্টার্সে। সর্বোচ্চ এই ডিগ্রি অর্জনেও সে সংকল্পবদ্ধ। লড়াই করে যে জেতা যায়, তা প্রমাণ করে দিল হার না মানা তরুণ সানাব উদ্দিন।
পরিবারের দৈন্যদশায়, বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আর নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতে সানাব উদ্দিন শুরু করে পানের ব্যবসায়। বাড়ি বাড়ি সাইকেল চালিয়ে পান নিয়ে হাজির হয় সে। শুরুতে বিক্রি কম হলেও পরে বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে আয়ও বাড়ে সানাব উদ্দিনের। এই পান বিক্রির টাকায় সে পড়ালেখার খরচ চালিয়ে, বাবা-মা’র ভরণপোষণসহ সংসার খরচেও হাত লাগায়।
গত ২৮ জুন দৈনিক কালজয়ী’র বিশেষ প্রতিনিধি নূরুল আলম আবির সানাব উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে একটি সাক্ষাতকার নেন। কথা হয় সফল তরুণ সানাব উদ্দিনের সাথে। সেদিন সানাব উদ্দিনের পিতা মোঃ ছবির আহমেদ অশ্রু সজল চোখে বলেন, আমার ছেলে বড় কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। তার যদি একটা সরকারি চাকরী হতো! তাহলে পূরণ হতো, আমাদের সবার স্বপ্ন।
এ সময় সানাব উদ্দিন বলেন, “আমি এখন থেকে সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করবো। পাশাপাশি মাস্টার্সও শেষ করবো। ভালো চাকুরী না পেলে ব্যবসায় শুরু করব। আমি যেহেতু ব্যবসায় বিভাগের ছাত্র, সেহেতু একজন ভালো ব্যবসায়ী হওয়াও আমার স্বপ্ন।”
এখনকার সমাজে অগণিত তরুণের সকল সুবিধা পেয়েও পড়ালেখা করতে তাদের বেশ অনীহা। যারা স্কুলে পড়ে, তাদের মধ্যেও বহু কিশোর লেখাপড়ায় অমনোযোগী। তাদের মধ্যে অনেকের নেশা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার। বহু কিশোর আজ মাদকাসক্ত, হয়ে পড়েছে বাবা-মা’র অবাধ্য। তাদের ভীড়ে সানাব উদ্দিন সবার থেকে আলাদা। সকল দুঃখ দৈন্যকে একপাশে রেখে, পান বিক্রি করে নিজের পড়ার খরচ চালিয়ে সে আজ স্নাতক পাশ করেছে। সেই তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া ক্ষুধে শিক্ষার্থী সানাব উদ্দিন এখন সচেতন ও শিক্ষিত এক তরুণ। সকল বাঁধা বিপত্তিকে জয় করে জীবনের পথে, আলোর পথে এগিয়ে চলা সানাব উদ্দিন হতে পারে পথভ্রম অগণিত তরুণের পথের দিশা। সানাব উদ্দিন এগিয়ে যাক তার স্বপ্নের পথে ধীরে ধীরে। তার মত এ দেশের প্রতিটি ছেলে হোক স্কুলমুখী। বুনে যাক নব নব সব চমৎকার স্বপ্ন।