যাপিত জীবনে লজ্জার কিছু নাই!

88

কালজয়ী রিপোর্ট: তখনও ঠিক সাবালক হয়ে উঠিনি, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়ি। কৈশোরত্তীর্ন বয়েসের স্বাভাবিক চপলতাটুকু ছিলো, দস্যিপনা ছিলো, ছিলো কিছুটা বাঁদরামি ও কি? তবে নষ্টামি টা ছিলোনা। আমাদের সময়টাই ছিলো এমন,মধ্যবিত্তের মূল্যবোধ, পারিবারিক শিক্ষা, পরিবেশ- প্রতিবেশ নোংরামি টা শেখায়নি। ফলে বড়দের আদর টাদর পেয়ে ছি বেশ, কিছু টা প্রশ্রয়ও। আর ছিলো অসাধারণ বন্ধু ভাগ্য, ইর্ষনীয় রকমের! লিহিন, নাছির, কাউসার, এখলাস, দুই শাহিন, কিবরিয়া, মমতাজ, রকি, সাদেক, মুসা,ইমন, আরিফ, সালাউদ্দিন, নিরোদ, হারুন ক’জনের নাম বলবো? একবার ইদি আমিন নামের এক টোকাই সন্ত্রাসী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক মেয়েকে জ্বালাতন করছিল, একেবারে ভিতর থেকে আসা তাগিদ থেকে প্রতিবাদ করলাম জোবরা গ্রামের কিছু বখাটে, সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা গ্রুপ ও,বিবাদে জড়িয়ে গেল। বিরাট গন্ডগোল। পাশে এসে দাঁড়ালো অকুতোভয় সব বন্ধুরা, সব দলের, সব মতের। পরে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। দীর্ঘদিন জোবড়া গ্রামের প্যান্ট পরা কোন ছেলে ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেনি। ( ইদি আমিন পরে ক্রসফায়ারে মারা যায়) প্রথম জয়, সত্যের, সুন্দরের, শুচি তার। তখন এরশাদ। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ঘনঘন ক্লোজড সাইনে ডাই, অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ, আমরা বলি এরশাদ ভ্যাকেশন। একসাথে বাড়ী ফিরি, আবার যাওয়ার সময় একসাথে। কুমিল্লা রেলস্টেশনে বাবা মারা মেয়েটিকে হাতে তুলে দিয়ে যায়, ‘ বাবা একটু দেখে রেখো ‘। কি দেখতেন চোখে মুখে অমন করে? একটু নির্ভরতার খোঁজ, নিরাপত্তার আশ্বাস? দায়িত্ববোধ? একটু শুচিতা ও কি? কি জানি। বড় হয়ে উঠছি। বড় ভাইদের, আপুদের ছায়া থেকে বেরোচ্ছি একটু একটু করে। ছোটদের সালাম টালামও পাওয়া শুরু হয়েছে ততদিনে। একটু একটু করে ক্যাম্পাসের বিচিত্রতায় মিলেমিশে যাওয়া, রাজনৈতিক মতাদর্শের পছন্দ – অপছন্দ। সব দলেই যে বন্ধু রা ! ব্যাতিক্রম শুধু একটি দল। ওরা টিভি দেখতে দেয়না, পত্রিকা পড়তে দেয়না, গান করতে দেয়না, বিতর্ক করতে দেয়না, কবিতা আবৃত্তি করতে দেয়না। আজব তো!! ছোট ছোট প্রতিবাদ।ওরা পেটায়। বড় প্রতিবাাদ। ওরা পেটায়। তারপর প্রতিরোধের চেষ্টা। ওরা পেটায়, ওরা খুন করে। ওরা দুই শাহিন কে ছুরি মারে, ওরা ফারুক কে হত্যা করে। ঘাড় ত্যারা আমরাও। এ হতে পারেনা, এ হয়না। লড়াই, লড়াই। পঙ্গপালের মতো পাশে এসে দাঁড়ায় বন্ধু রা সব। রাজনীতির, রাজনীতির বাইরের, ছেলেরা, মেয়েরা, শিক্ষকরা, শিক্ষিকারা, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার, পুরো দেশ। আমরা জিতে যাই। এভাবেই আমাদের বেড়ে উঠা। বিজয় আমাদের মাথা খারাপ করে দেয়নি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডার বাজী করিনি, চাঁদাবাজি করিনি। তখনও আজকের মতোই সে সুযোগ ছিলো। অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় দেইনি, নোংরামি করিনি, ছোট হয়ে যাওয়ার মত কোন কাজ করিনি। পুরো একটি প্রজন্ম কে সাক্ষী রেখে কথাগুলো বললাম, মাথা উঁচু করেই বললাম। আসলে আমাদের নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপায়ই ছিলো না, মানুষের ভালোবাসা ঘিরে রেখেছিলো যে! মানুষের ভালোবাসার চোখ কে অগ্রাহ্য করা যায়না, উপেক্ষা করা যায়না। হায়! আমাদের নেতারা যদি সবাই সেটা বুঝতেন!! আজও আমরা ডাকলে তাই মানুষ আসে আমাদের প্রজন্মের সাহসী সন্তানেরা। ছেলেরা, মেয়েরা, শিক্ষকরা, শিক্ষিকারা। রাজনীতিতে যারা স্বচ্ছ ধারা চায়, মুক্ত বুদ্ধির চর্চা চায়, স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত হতে চায়, অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলতে চায়। যাঁরা মনে করে সত্য নির্ভরশীল প্রপঞ্চ নয়, সত্য শক্তি আশ্রিত ও নয়। শক্তি দিয়ে সত্যের অবদমন ও করা যায়না। তারপর ও অন্ধকারের শক্তি তার হিংস্র থাবা বাড়ানো বন্ধ করবেনা। এখনো টাউন হলের গেট এ ওঁৎ পেতে থাকবে ঘাতক। মৃত্যুকে ভয় পাইনা, শুধু মহানের কাছে প্রার্থনা করি, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেন দেখতে পাই, যাপিত জীবনে লজ্জার কিছু নাই।

লেখক: তারিকুল হক,সাবেক ভারপ্রাপ্ত ভিপি, চাকসু।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here