ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যানবাহন চলে হেলেদুলে!

71

কালজয়ী রিপোর্ট: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে মালবাহী বাহনের অসামঞ্জস্য, অতিরিক্ত যানবাহন চলাচল ছাড়াও দুর্ভোগের পেছনে অন্যতম কারণ ত্রুটিপূর্ণ মেরামত। ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায় বর্তমানে উচু নিচু হত্তয়ায় যানবাহন চলছে খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় হেলেদুলে মন্থরগতিতে। মহাসড়কের কাঁচপুর ব্রীজ থেকে মেঘনা ব্রীজ পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা সবচেয়ে বেশি বেহাল ও ঝুর্কিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে রয়েছে। অপর দিকে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কে দুভোর্গ দীর্ঘদিনের। আঞ্চলিক এ মহাসড়কটিতে জনসাধারনের চলাচলে স্বস্তি আনতে ফোর লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কুমিল্লা নগরীর টমছম ব্রিজ থেকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ পর্যন্ত ৫৯ কিলোমিটার সড়কের ফোর লেনে উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। ২ হাজার ১শ’ ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ কাজটি ২০২০ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে কাজ চলার কারনে সড়কটিতে ছোট বড় মিলিয়ে অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হয়েছে এছাড়াও কাজ চলাকালে পানি না দেয়ায় ধুলাবালিতে সমস্যায় পড়ছে ঈদে ঘরমুখী যাত্রীদের অভিযোগ। ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের এশিয়া লাইন পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের চালক তফাজ্জল ইসলাম বলেন, ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের চার লাইনের কাজ শেষ হত্তয়ায় ভেবেছিলাম আরোও ১০ বছরেও মহাসড়কে ভাঙন ধরবে না। কিন্তু গত ক’য়েক বছরেই মহাসড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ আগের অবস্থায় ফিরে আসে। অথচ নির্মাতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই সড়কের ভারবাহী ক্ষমতার কোনো ক্ষতি হবে না, কোনো সংস্কারও করতে হবে না। কিন্তু মাত্র ক’য়েক বছর পার না হতেই সড়কটি যান চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে কুমিল্লা অঞ্চলের ১২৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম জোনের ৬৬ দশমিক ৩৮ কিলোমিটারসহ ১৯০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের জন্য নতুন করে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এ প্রকল্পে মেরামত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া স্থান বিশেষে মজবুতকরণ প্রস্তাবও করা হয়েছে পাঠানো ডিপিপিতে। ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য সংস্কারের এ প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রকল্প-সংশ্নিষ্টরা দাবি করছেন, স্কেলে দুর্নীতি, ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত ভারবাহী যান চলাচল এবং নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রীর কারণেই হাজার কোটি টাকার সড়কের এই হাল। চার লেন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আফতাব হোসেন খান বলেন, সড়ক দিয়ে সংখ্যায় বেশি এবং ওভারলোডেড যানবাহন চলাচল করায় সঙ্গত কারণেই প্রতিদিন মেগা এ প্রকল্পের ক্ষতি হচ্ছে। মেরামতও চলছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে প্রায় দেড় বছর আগেই এ সড়কে পাঁচ বছর ধরে সংস্কারের জন্য প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যখন এটি নির্মাণ করছিল তখন প্যানেল অব এক্সপার্টদের পক্ষ থেকেও অত্যধিক ভারবাহী যান চলাচলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মহাসড়কটি নিয়মিত পরিচর্যা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।

এছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চৌদ্দটি পয়েন্টে সারা বছরই লেগে থাকে দুর্ভোগ। চার লেন প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এই চৌদ্দটি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছিল। এগুলো হল কুমিল্লার দাউদকান্দি, গৌরীপুর, চান্দিনা, নিমসার, চৌদ্দগ্রাম চট্রগ্রামের ভাটিয়ারী, বাড়বকুন্ড, সীতাকুন্ড সদর, বড় দারোগাহাট, মিরসরাইয়ের হাদি ফকিরহাট, মিরসরাই পৌরসদর, মিঠাছড়া ও বারইয়ারহাট পৌরসদর। ত্তইসব পয়েন্টে বড় ধরনের মেরামত এবং একাধিকবার বিটুমিনের প্রলেপ দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই অতিরিক্ত গাড়ীর চাপ ও ভাড়ি যানবাহন চলাচলের কারনে বিটুমিনের প্রলেপ এবং মাস না যেতে ফের আগের পরিণতি হয় বড় ধরনের মেরামতও। ফলে যানবাহন বিকল হয়ে সৃষ্ট যানজটে মাইলের পর মাইলজুড়ে সৃষ্টি হয় সড়ক পথের হাহাকার। গত দুদিন ধরে মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নানা চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে মহাসড়কের কাঁচপুর ব্রীজ থেকে মেঘনা ব্রীজ পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা সবচেয়ে বেশি বেহাল। গত কয়েক মাস ওই এলাকায় যানজটের কারনে ওই সড়কে অবস্থা খুব নাজুক। বিভিন্ন জায়গায় উচু নিচু হত্তয়ায় যানবাহন চলছে খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। ছোট গাড়িগুলো রাতের অন্ধকারে উচু নিচুর কারনে উল্টিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এচাড়াও চৌদ্দটি পয়েন্টের কোথাও কোথাও মাটি নষ্ট হয়ে গেছে উল্লেখ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আরিফুর রহমান জিন্নাহ বলেন, এই চৌদ্দটি পয়েন্টে যানবাহন চলাচলের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে মাটি পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। তবে নিজেদের ত্রুটির কথা অস্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রেজা কনস্ট্রাকশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, অতিরিক্ত যানবাহন এবং অতিরিক্ত মালবাহী গাড়ির চাপে সড়কের এমন পরিণতি হয়। সরেজমিন দেখা গেছে, এ সড়কের হার্ড সোল্ডারের পাশে মাটির অংশে পানি জমে থাকে। একই অবস্থা ফেনী রেললাইন এলাকায়ও। নিয়মিত এ মহাসড়ক চলাচল করেন আনোয়ার কামাল। তিনি বলেন, অতিরিক্ত যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সীতাকুন্ডের বারৈয়ারহাটসহ একাধিক পয়েন্টে ফ্লাইওভার নির্মাণে প্রকল্প নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।

চার লেন সড়কটির নকশা করার সময় সম্মিলিত আদর্শ স্কেল বা ভারবহন ক্ষমতা ধরা হয় সাড়ে নয় কোটি, যা ২০২৩ সালে অতিক্রম করার কথা। কিন্তু দেখা গেছে, ২০১৭ সালেই আদর্শ স্কেলের এর ভারবহন ক্ষমতা অতিক্রম করেছে সড়কটি। ২০১৭ সালে চার লেনে ট্রাফিক ও এক্সেল লোড সমীক্ষা থেকে এ তথ্য বেরিয়ে আসে। এতে দৈনিক প্রায় ৬০ হাজার যান (যেগুলোর মধ্যে ১০-১২ হাজার ওভারলোডেড ট্রাক-কার্ভাডভ্যানও রয়েছে) চলাচল করায় মহাসড়কটিতে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। সওজের গাইডলাইন অনুসরণ না করায় মহাসড়কটির আয়ুস্কালও দ্রুত কমে আসছে। এতে আগামী বছরগুলোতে সড়কটির উপরিভাগ স্বাভাবিক রাখা দুস্কর হয়ে উঠবে। বর্ষাকালে সড়কের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক বিশেষজ্ঞরা। এদিকে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কে দুভোর্গ দীর্ঘদিনের। আঞ্চলিক এ মহাসড়কটিতে জনসাধারনের চলাচলে স্বস্তি আনতে ফোর লেনে উন্নীত করার কাজ চলার কারনে ছোট –বড় অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি ছাড়াও ধুলাবালিতে সমস্যায় পড়ছে ঈদে ঘরমুখী যাত্রীরা। সড়কটি ফোর লেনের কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা। সড়কটির ৫০ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এই সড়কটির ফোর লেনের কাজ সম্পন্ন হলে নিরসন হবে যানযট। এতে যোগাযোগে সুবিধা পাবে কুমিল্লা- নোয়াখালী সড়কের যাত্রীরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here