কমলগঞ্জে মণিপুরী “লাই-হারাওবা” পাঁচ দিনব্যাপী উৎসব শেষ হচ্ছে আজ

85
কে এস এম আরিফুল ইসলাম: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নস্থ কোনাগাঁও গ্রামের “উজাও- লাইরেম্বী লাইশং” মন্দির প্রাঙ্গণে গত ২৭ এপ্রিল শুরু হাওয়া পাঁচদিনব্যাপী মণিপুরী জনগোষ্ঠীর অতি প্রাচীনতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘লাই-হারাওবা  বা “ঈশ্বরের উপাসনা” উৎসব আজ ১ মে রাতে শেষ হচ্ছে।
এ উৎসবে মণিপুরিদের ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী প্রতিদিন মাইবা (দেবদাস), মাইবীরা (দেবদাসী) এবং তাদের সহযোগীরা ঐশ্বরীক বাণীসহ লোকগান, লোকনৃত্য ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পরিবেশনের মাধ্যমে, আতিয়া সিদবা বা দেবতাদের ইচ্ছা অনুসারে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি এবং উদ্ভিদ ও প্রাণিগুলির বিবর্তনের গল্প উপস্থাপন করা হয়। স্থানীয়  উদয়ন সংঘের আয়োজনে এ উৎসবে ভারত ও বাংলাদেশের জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিবর্গসহ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে কয়েক হাজার ভক্তের সমাগম ঘটছে। মণিপুরিদের বিশ্বাস, প্রতি বছর গ্রীষ্মকালীন পর্বের আগমনের সময় ঈশ্বর মানুষের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য পৃথিবী পরিদর্শন করেন। আর পৃথিবীর মানুষ আনন্দে এই অনুষ্ঠান উদযাপন করে। এই উৎসবটি মণিপুরী সংস্কৃতির সঙ্গে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িত। এটি মূলত, সনামহী ধর্মের ঐতিহ্যগত দেবতাদেরকে উৎসাহিত করার জন্য উদযাপন করা হয়। এই উৎসবে প্রদর্শিত নৃত্য সমূহকে মণিপুরী নৃত্যশৈলীর একটি সুপ্রাচীন নৃত্যধারা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মণিপুরী সমাজে প্রচলিত অন্যতম প্রাচীন লোকনৃত্যানুষ্ঠান ‘লাই হারাওবা জাগোই’ থেকেই এসেছে এই ‘লাই-হারাওবা উৎসব’।
লাই শব্দের অর্থ ইশ্বর, হারাওবা অর্থ আনন্দ এবং জাগোই অর্থ নৃত্য। অর্থাৎ নাচ গানের মাধ্যমে ঈশ্বরকে আনন্দদায়ক করে তোলা। এর ইতিহাস এরকম সৃষ্টিকর্তা যখন জড় ও জীব পৃথিবী সৃষ্টি করলেন এবং পরবর্তীকালে স্রষ্টার মূর্তির অনুকরণে মনুষ্য সৃষ্টিতে সফলতা পেলেন তখন দেবদেবীগণ আনন্দে যে নৃত্য প্রকাশ করেছিলেন তারই নাম দেয়া হয়েছে লাই-হারাওবা নৃত্য। তাই লাই-হারাওবা নৃত্যে দেখা যায় পৃথিবীর সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে শুরু করে গৃহায়ন, শস্যবপন, জন্ম-মৃত্যু সবকিছুই নৃত্য ও সঙ্গীতের সুর লহরীতে ঝংকৃত হয়। এ নৃত্যের আঙ্গিক অংশগুলো যেমন লৈশেম জাগোই (সৃষ্টিনৃত্য), লৈতা জাগোই (গৃহায়ন নৃত্য) লৈসা জাগোই (কুমারী নৃত্য) প্রভৃতি মণিপুরী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে লোক সংস্কৃতি হিসেবে প্রদর্শিত হয়। সৃষ্টিলগ্ন থেকে ছয় ধরনের প্রধান লাই-হারাওবা উৎসব উদযাপিত হয়ে থাকলেও বর্তমানে লাই-হারাওবা নৃত্য দুই ভাবধারায় পরিবেশিত হয়। এই ভাবধারা দুটি হলো মৈরাঙ লাই-হারাওবা ও উমঙ লাই-হারাওবা। এই দুটি ধারাতেই পরিবশিত হয় নানা ধরনের কাহিনী নির্ভর নৃত্যগীত। এই নাচে তান্ডব ও লাস্য উভয় ধারাই ব্যবহৃত হয়। এই নৃত্য শৈব নৃত্যধারার হলেও, এতে পরবর্তী সময়ে রাসনৃত্যের ভঙ্গীপারেঙ-এর প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে। এই নৃত্যধারার সাথে জড়িয়ে আছে, মণিপুরের সনাতন ধর্মে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্ব। মণিপুরের লোক পুরাণ মতে- নয়জন লাইবুঙথ (দেবতা) এবং সাতজন লাইনুরা (দেবী) পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। আদিতে পৃথিবী জলমগ্ন ছিল, আর সেই জলের উপর সাতজন লাইনুরা নৃত্য করছিলেন। এই দৃশ্য দেখে নয়জন লাইবুঙথ স্বর্গ থেকে লাইনুরাদের লক্ষ্য করে মাটি নিক্ষেপ করতে থাকেন। নৃত্যরতা সাতজন লাইনুরা সেই ছুঁড়ে দেওয়া মাটির উপর নেচে নেচে পৃথিবীর স্থলভাগ তৈরি করেন। এই ভাবনা থেকে লাই-হারাওবা নৃত্যের সূচনা হয়। এই নৃত্যে অংশগ্রহণ করেন কিছু দেবদাস এবং দেবদাসী।
উল্লেখ্য, মণিপুরে দেবতাদের সেবায় যে পুরুষরা সারাজীবন নিজেদেরকে উৎসর্গ করেন, তাদের বলা হয় মাইবা (দেবদাস)। একইভাবে যে নারীরা দেবতাদের সেবায় সারাজীবন নিজেদেরকে উৎসর্গ করেন, তাদের বলা হয় মাইবী (দেবদাসী)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here