বৈশাখ এলে মনে পড়ে

99

আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয়: বৈশাখের স্বরুপ বিশ্লেষন এই দিনটির গুরুত্ব ও কোনো অংশে কম নয়। কবি কালিদাস পন্ডিত তার “ঋতু সংহার” বৈশাখ তথা গ্রীষ্ম ঋতুর সূচনা নিয়ে অবিষ্মরনীয় কবিতা রচনা করেছেন। আমাদের দেশের মতো বিশ্বের নানা দেশে বর্ষবরনের প্রচলন রয়েছে। তবে বিবর্তনের ধারায় আমাদের দেশের সংস্কৃতি মিত্র সংস্কৃতির রুপান্তরিত হলেও বাঙ্গালির নিজস্বতা একেবারে বিলীন হয়নি। দেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মিশেল ঘটেছে মাত্র। সুতরাং বৈশাখ বা নববর্ষ পালনের যে বর্তমান চাকচিক্য তাতে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির মিল খুঁজে পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। পাশ্চাত্যের বর্ষবরনের আদলে আমাদের দেশেও বর্তমানে কার্ডের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান সংগীত নৃত্যের মাধ্যমে প্রানে জাতি সঞ্চার এবং সর্বশেষ কোন সংস্কৃতির মাধ্যমে ক্ষুদে বার্তা প্রেরন, ইমু, ভাইবার, টুইটার এবং ফেসবুকীয় শুভেচ্ছা বিনিময় এ ক্ষেতে নবতর ধারায় সূচনা করেছে। তবে পহেলা বৈশাখের যেমন, যাত্রা পালা, কবিগান, গাজির গান, পুতুল নাচ, বাউল মুর্শীদি ভাটিয়ালি গান, লাইলি মজনু, রাধা কৃষ্ণ, ইউসুফ-জুলেখা, হাসন রাজা, ইত্যাদি পালা দর্শনের আয়োজন করা হয় প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে। এ ছাড়া ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ যুদ্ধ এবং কোথাও কোথাও নৌকাবাইচের ও আয়োজন করা হয়। বৈশাখের পৌরানিক প্রেক্ষিত বিশ্লেষনে দেখা যায়, “মাস হিসেবে বৈশাখের একটা স্বতন্ত্র্য পরিচয় আছে, যা প্রকৃতিতে ও মানবজীবনে প্রত্যক্ষ করা যায়। ঘররৌদ্র, দাবদাহ, ধু-ধু-মাঠ, জলাভাব, কালবৈশাখীর ঝড়, ঝরাপাতা, গাছে গাছে নতুন পাতায় আবির্ভাব, আমের কলি ইত্যাদি প্রকৃতি পরিবেশের রুপ-রুপান্তের সঙ্গে বাংলার মানুষের মন-প্রান-আত্মার যোগ আছে।

বৈশাখ এলে মনে পড়ে ছোট বেলার বৈশাখের দিনগুলো কথা-ছোটবেলার দিনগুলো বড়ই আনন্দের ছিল। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “সে যে আমার নানান রঙ্গের দিনগুলো সোনার খাঁচায় রইল না”, সত্যিই জীবনের সুন্দর মুহুর্তগুলোকে আমরা বেধে রাখতে পারি না। যে দিন গ্রামে মেলা বসতো সেদিন মনে করে নিতাম এবং মনে আনন্দ অনুভূতি আসতো আর বলতাম আজ পহেলা বৈশাখ। আর বৈশাখ এলেই অনেক ধরনের বায়না ধরতাম মা বাবার কাছে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাইতে হবে, টাকা দিতে হবে, না হয় মেলা নিয়ে যেতে হবে, কিছু কিনে দিতে হবে। মনে তখনেই আনন্দ আসিতো যখন দেখতাম মেলায় অসংখ্য মানুষের মহা সমাবেশ আমার মতো অনেক শিশুরা এক সাথে জরো হয়ে বাশিঁ বাজায়তো, আবার কেউবা বেলুন, ঘুড়ি আকাশে উড়াতো সত্যি তা দেখে অনেক আনন্দ পাইতাম। বৈশাখ আমাকে বার-বার মনে করিয়ে দেয় ছোট্টবেলায় যখন মামার বাড়ীতে যেতাম তখনেই মেলায় নতুন বৈশাখীর কাপড় অথবা নতুন নতুন কিছুর কেনার জন্যে কান্না কাটি করতাম আর হরেক রকমের বায়না ধরতাম আমাকে ওইটা, এইটা, কিনে দিতে হবে। আর কিছু কিনে যদি বাড়ীতে নিয়ে আসতে পারতাম তখনেই সঙ্গীয় সাথীদের কাছে গিয়ে দেখাতাম আর বলতাম দেখো আমাকে আমার মামা কিনে দিয়েছে। এইভাবে বলে তাদেরকে লালস দেখাতাম। মাঝে মাঝে আমারদের বাড়ির সঙ্গীসাথীদেরকে নিয়ে হাঁটতে হাটতে অনেক দূর চলে যেতাম। দলবেধে হৈহুল্লোড় করতে করতে আমরা এগিয়ে যেতাম সামনের দিকে। আমরা এগিয়ে যেতাম সামনের দিকে। কখনো চিৎকার করতাম, কখনো গলা ছেড়ে গান গাইতাম। কখনো কবিতার একটি কি দুইটি লাইন বলতাম। সকালের স্নিগ্ধ বাতাসে আমাদের দেহপ্রান জুড়িয়ে যেত। মন খুশিতে নেচে উঠত। মানুষজন যেন প্রান ফিরে পেত। আমাদের খুশি দেখে গাছের ডালে বসে পাখিরা গান গাইত। পূর্ব দিক থেকে সূর্য্যমিামা উকি দিয়ে আমাদের সাথে কথা বলত। মনে মনে ভাবতাম, আহ কতইনা মজা হত সকল দিন যদি বৈশাখের দিনের মতো হত। এই দিন অনেক পরিবার পান্তা ভাত আর ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেত। এছাড়া প্রায় প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে পান্তা ভাতের ব্যবস্থা থাকত। পোড়া মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া মজাই আলাদা। জীবনের প্রতিটি মূহুর্তে বৈশাখের আনন্দের মূহুর্তগুলি বার বার হৃদয়ে গুঞ্জন করে ওঠে। তবে নতুন বছরে বৈশাখের অতীতের সকল দুঃখ ভুলে বয়ে আনুক সবার জীবনে আনন্দ ও একে অপরের উপর ভালোবাসা বৃদ্ধি পাক এ কামনা সর্বত্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here