ভালোবাসার দৃষ্টান্ত সুতানাল দিঘি

48

 হামিদুর রহমান: দিঘির নামকরন হয় সুতানাল, কমলারাণি বা বিরহীনি কয়েকটি নামেই । তবে সুতানাল পুকুর নামেই পরিচিত এলাকায়। শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নে মধ্যমকুড়া গ্রামে ৬০ একর জমির উপর দিঘিটি অবস্থিত। উপজেলা সদর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দুরে দিঘিটি। প্রতি বছর দুরদুরান্ত থেকে মৎস্য শিকারী ও উৎসুক মানুষের আনাগোনায় পুকুর ও এলাকার পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসব মুখর।

এ দিঘির মাছ খুব সুস্বাদু বলে প্রশংসা রয়েছে বেশ। ১৯৮৩ সালে এই দিঘিকে কেন্দ্র করে ভূমিহীন ১১৮ জন সদস্য নিয়ে গড়ে ওঠে“সুতানালি দিঘিরপাড় ভুমিহীন মজাপুকুর সমবায় সমিতি। পুকুর পাড়েই তাদের বসবাস। এই পুকুরকে কেন্দ্র করে ভুমিহীনদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে।

দিঘিটি কে কখন কোন উদ্দেশ্যে খনন করেছিলেন তার ইতিহাস নির্ভর কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এলাকার প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়,মোগল আমলের শেষের দিকে এ গ্রামে কোন এক সামন্ত রাজার বাড়ি ছিল। আবার কেউ বলেন এখানে বৌদ্ধ বিহার ছিল। কথিত আছে সামন্ত রাজা তাঁর সহধর্মীনী রাণীকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের জন্য উপহার দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাণী তখন রাজাকে বলেন, ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে আপনি এমন কিছু দান করুন যা যুগযুগ ধরে মানুষ মনে রাখে।

রাজা তখন সিদ্ধান্ত নিলেন অবিরাম একরাত একদিন সুতা কাটা হবে। যে পরিমান সুতা হবে সেই সুতার সম পরিমান লম্বা এবং প্রশস্ত একটি দিঘি খনন করা হবে। এলাকার জনগণ দিঘির জল ব্যবহার করবে। আর তোমাকে স্মরণ করবে।

দিনের পর দিন খননকাজ চলে। নির্মিত হয় বিশাল এক দিঘি। এক পাড়ে দাঁড়ালে অন্য পাড়ের লোক চেনা যায় না। খননের পর দিঘিতে জল ওঠেনি। জল না ওঠায় সবাই যখন চিন্তিত। কমলারাণি তখন স্বপ্নাদেশ পান “গঙ্গাপুজা কর নরবলি দিয়া,তবেই উঠিবে দিঘি জলেতে ভরিয়া।” স্বপ্ন দেখে রাণি চিন্তিত হয়ে পড়েন। নরবলি না দিয়ে রাণি গঙ্গামাতাকে প্রণতি জানানোর জন্য মহাধুমধামে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দিঘির মাঝখানে গঙ্গাপুজার আয়োজন করা হয়।

কমলারাণি গঙ্গামাতার পায়ে প্রার্থনা জানিয়ে বলেন,“কোন মায়ের বুক করিয়া খালি,তোমারে দিব মাতা নরবলি। আমি যে সন্তানের মা,আশায় করিয়া ক্ষমা কোলে তুলিয়া নাও। মা পুর্ণকর তোমার পুজা।” হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দে দিঘিতে জল উঠতে লাগলো। লোকজন দৌড়ে পাড়ে উঠতে পাড়লেও দিঘির টইটুম্বুর জলে রাণি তলিয়ে গেলেন। কমলা রাণি আর তীরে উঠতে পাড়েনি। সেই থেকে কমলা রাণি বা সুতানাল দিঘি নামে পরিচিতি পায়।

“নালিতাবাড়ী মাটি মানুষ এবং আমি”সাবেক এমপি ও মন্ত্রী অধ্যাপক আবদুস সালাম রচিত বই থেকে জানা যায়,খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দিতে শালমারা গ্রামে সশাল নামের এক গাড়ো রাজা রাজত্ব করতেন। সামশ ইলিয়াস শাহ তখন বাংলার শাসন কর্তা। সশাল রাজার রাজধানী ছিল শালমারা গ্রামে। ১৩৫১ সালে তিনি সশাল বিরোদ্ধে সেনা প্রেরন করেন। রাজা পলায়ন করে আশ্রয় নেন জঙ্গলে। পরবর্তীকালে সশাল রাজা শত্রুর আক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়ার পর দিঘির মাঝখানে ছোট্র একটি ঘর তৈরি করে দিঘির চারদিকে পরিখার মতো খনন করেন। রাজা যখন সেখানে অবস্থান করতেন তখন তার বাহিনী বড় বড় ডিঙি নৌকা নিয়ে দিঘির চারদিকে পাহাড়া দিত। কালক্রমে, ঐভুখন্ডটি ধসে দিঘিতে রুপনিয়েছে। রাজার শেষ বংশধর ছিলেন রাণি বিরহীনি। দিঘিটি রাণি বিরহীনি নামেও পরিচিতি পায়। ১৯৪০ সালে সরকারী ভুমি জরিপে দিঘিটি বিরহীনি নামেই রেকর্ড হয়েছে। তবে দিঘিটি খননের সত্যিকার দিন,ক্ষন,ইতিহাস জানা যায়নি। তবে দেশের জন্য একটা ঐতিহাসিক নিদর্শন হতে পাড়ে।

দিঘিটিকে আরো সুন্দর ও নান্দনিক সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুস সামাদ গত ৫ এপ্রিল স্থানীয় প্রেসক্লাবে বসে উপজেলা নিবাহী অফিসার আরিফুর রহমান ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শহিদ উল্লাহ তালুকদার মুকুলকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলেন। পাড়ে বসবাসরত মানুষগুলোকে অন্যত্র জায়গা দিয়ে এই পুকুরটি যাতে পর্যটকদের দৃষ্টি আর্কষন করে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে নির্দেশ প্রদান করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here