দুই বাঙলার নাট্যোৎসবের শেষ দিন মন কাড়ল শিলিগুড়ির নাটক ‘একুশে অঞ্জলি’

89
হুমায়ুন কবির সূর্য্য:
কুড়িগ্রামে দুই বাংলার ৫দিন ব্যাপি নাট্যোৎসবের শেষ দিন দর্শকদের মন কাড়ল ভারতের শিলিগুড়ির সৃজনসেনা নাট্যগোষ্ঠীর ভাষা আন্দোলন নিয়ে নাটক ‘একুশে অঞ্জলি।’ এই নাটকের মাধ্যমে কলাকুশলীরাও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে নতুন করে জানতে পেরেছে ইতিহাসের ভেতরের ইতিহাস। এই নাটক একুশে ফেব্রুয়ারির মর্যাদা, ভাষা আন্দোলন আর বাস্তব সংসারের আটপৌড়ে যাপিত জীবন নিয়ে একটা দুর্দান্ত মেসেস।
কুড়িগ্রাম শহরের কলেজ মোড়স্থ নতুন টাউন হলে প্রদর্শিত এই নাটক দেখতে দর্শকদের ছিল উপচে পড়া ভীর। পুরো মিলনায়তন জুড়ে ছিল ঠাসাঠাসি দর্শক। কুড়িগ্রামের সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রচ্ছদ তাদের চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই বাংলার নাট্যগোষ্ঠীকে নিয়ে ৫দিন ব্যাপি নাটক প্রদর্শন করে। এতে ভারতের কলকাতা থেকে মিউনাস নাট্যদল ও শিলিগুড়ি থেকে সৃজনসেনা অংশগ্রহন করে। পাশাপাশি ঢাকা থেকে শব্দ নাট্যচর্চা, রংপুর থেকে রংপুর নাট্যকেন্দ্র এবং কুড়িগ্রামের আয়োজক প্রচ্ছদ এতে অংশ নেয়। শেষ দিন সৃজনসেনা দুটি নাটক প্রদর্শন করে। এরমধ্যে একটি ‘একুশে অঞ্জলি’ এবং অপরটি ‘ম্যানিকুইন’। দুটো নাটক দেখতে ভীড় জমিয়েছেন বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ। রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ধর্য ধরে নাটক উপবোগ করে দর্শকরা। তারা কখনো হেসেছেন কখনো হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিয়েছেন। কখনো বা সিক্ত হয়ে গেছে তাদের চোখ।
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জামিল জানান, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে উপজীব্য নাটকটি ভারতের বাঙালী শিল্পীদের অভিনয়ে দু’বাংলার তীব্র ভালবাসা ও আবেগ ফুটে উঠেছে। মঞ্চে একুশের শহীদ মিনার দেখে গা শিউরে উঠেছে। সত্যি আমি অভিভূত।
নাটকের এই প্রাণের মেলায় কথা হয়েছে অভিনয় শিল্পী এবং মঞ্চের আড়ালে থাকা মূল সংগঠকদের সাথে। তারা জানিয়েছে নিজেদের অনেক আশা, আকাংখা আর আবেগের কথা। একুশে অঞ্জলি নাটকের মাধ্যমে বার্ধক্যে পোঁছানো দুজন মানুষের স্মৃতি বিজড়িত ভাষা আন্দোলনের ঘটনা উপজীব্য হয়ে উঠেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতবর্ষে চলে আসতে বাধ্য হওয়া বার্ধ্যকের দ্বাড়প্রান্তে পৌঁছানো এই দম্পতি এক সময় প্রেমে মজেছিল, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনে মিছিলে মিছিলে রাজপথ কাঁপিয়েছিল। তারপর তারা চলে আসে ভারতীয় উদ্বাস্ত শিবিরে। একুশে ফেব্রুয়ারি আসলেই কেমন কাটে তাদের সময়। এখানে এখনো কী লড়াই করতে হচ্ছে তাদেরকে? ঘরে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া ছেলের বৌয়ের সাথে সম্পর্কটা বা কেমন দাঁড়ায়-এই নিয়ে এগিয়ে চলে নাটক।
একুশে অঞ্জলি নাটকে বৃদ্ধা চরিত্রে অভিনয় শিল্পী জোনাকি মৈত্র এই প্রতিবেদককে জানান, আমরা এই নাটকটা করতে গিয়ে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক কিছু জেনেছি, জানতে পেরেছি। যেগুলো আগে হয়তো কখনো শুনিনি বা নিজেরা হয়তো জানতাম না। বাংলাদেশে ভাষার জন্য যে লড়াই হয়েছে, রক্তক্ষয় হয়েছে, নাটকটা করার সময় নিজের মনের মধ্যে সেই অবদমিত তারণাটি জেগে উঠেছিল। কতটা কষ্ট করে, রক্ত বিসর্জন দিয়ে তারা জাতীয় ভাষা হিসেবে বাংলাকে অর্জন করতে লড়াই করেছে। তা ভাবতে গিয়ে আমি ভীষণ আবেগ-আপ্লত হয়ে গিয়েছিলাম।
নাটকটির রচয়িতা এবং নির্দেশক পার্থপ্রতিম মিত্র জানান, আমাদের মিশনটা হল আমাদের ভাষা এক, ভালবাসা এক, মানবতা এক। একুশে ফেব্রুয়ারি ওপার বাংলার মানুষের জন্য একটা আবেগের জায়গা। আমরা ওপার বাংলার মানুষ প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদায় একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করি। মাতৃভাষার জন্য বাঙালীদের আত্মত্যাগের কারণে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে বাংলাভাষা মর্যাদা লাভ করেছে। ভাষা আন্দোলনে বাঙালী জাতিসত্বার যে আবেগ সেটা থেমে থাকেনি। এখানো ভাষার উপর আক্রমন হচ্ছে। যা এই নাটকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম প্রচ্ছদ’র সাধারণ সম্পাদক শ্যামল ভৌমিক জানান, এপার বাংলা ওপার বাংলার মানুষের ভাষা-সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার সবই এক। মানচিত্র ও সীমারেখার কারণে আমরা দু’পাড়ে থাকলেও আমাদের মধ্যে সংস্কৃতি আদান প্রদানের জন্য দুই বাংলার নাট্যগোষ্ঠী নিয়ে এই উৎসব পালন করা হচ্ছে।
কলকাতা থেকে মিউনাস নাট্যদল নিয়ে আসা নাট্য সংগঠক উৎসব দাস বলেন, এই উৎসবের মধ্যদিয়ে আমরা দুই বাংলার শিল্পীরা এক হতে পারি। এটা আমাদের জন্য অনেক সম্মানের জায়গা। প্রচ্ছদ কুড়িগ্রামের আয়োজনে এই নাট্যোৎসব সফল হয়েছে বলে আমি মনে করি। হলরুমে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত থিয়েটার দেখার জন্য মানুষ অপেক্ষা করছে। এটা ভাবাই যায় না। কানায় কানায় ভর্তি দর্শক দেখে আমি সত্যি অবিভূত। এটা শুধু প্রচ্ছদের জয় নয়, এটা থিয়েটারের জয়, থিয়েটারের মানুষগুলোর জয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here