বুকের ঘরে শুরু হয়েছে প্রকম্পন, আনাগোনা বেড়ে গেল যমদূতের !

161

নূরুল আলম আবির: আমাদের প্রাণের চৌদ্দগ্রামে একদিনে করোনা রেকর্ড করেছে। সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-প্রত্যাশা চূর্ণ করে করোনা এখন চোখ রাঙ্গাচ্ছে আমাদের নাকের ডগায়। ২৫ মে একদিনে চৌদ্দগ্রামে সর্বোচ্চ ৭জন আক্রান্ত হয়েছে! এর আগের তিনজন সহ মোট সংখ্যা দাঁড়াল ১০ এ। চৌদ্দগ্রামের এমপি সাবেক রেলপথ মন্ত্রী মোঃ মুজিবুল হক, পৌর মেয়র মিজানুর রহমান সহ অন্যান্য সকল জনপ্রতিনিধি, ইউএনও মাসুদ রানার নেতৃত্বে উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও থানা প্রশাসনের ঘাম ঝরানো প্রচেষ্টা অবশেষে ব্যর্থতায় পরিণত হতে চলল। আমাদের বুকের ঘরে শুরু হয়ে গেল প্রকম্পন। আনাগোনা বেড়ে গেল যমদূতের। এখন কথা হলো এই যমদূতকে আনলো কে? সকল পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রতীয়মান হয়েছে— বাহির থেকে লোকজন এসেই আমাদের সর্বনাশ করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী করোনা আক্রান্ত এলাকার লোকজনের লাগামহীন চলাফেরার কারণে আমরা বিপদে পড়ে গেলাম। আর ঈদের কারণে বাহির থেকে লোকজন আসায় সমস্যাটা প্রকট আকার ধারণ করেছে।

চৌদ্দগ্রামের ৪২৯ গ্রামের মানুষকে সচেতন হতে হবে। জীবন রক্ষার জন্য বাহির থেকে, শহর থেকে আসা ব্যাক্তির হোম কোয়ারেন্টিন সবাই মিলে নিশ্চিত করতে হবে। তা না করে উপায় নেই। যারা শহর থেকে এসেছেন আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি আপনি ঘরের বাহির হবেন না। আপনার পায়ে ধরি আমাদেরকে শেষ করে দেবেন না। আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন চৌদ্দগ্রামে পালিয়ে আসায়ও সমস্যা হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের আদেশ অমান্য করে লাগাহীন ঈদ শপিং, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা, গণজমায়েত করে বাজার করা, জটলা পাকিয়ে আড্ডা দেওয়া, অতি আবেগী হয়ে ঘরে নামাজ না পড়ে মসজিদের জামাতে শরিক হওয়ার কঠিন ফলই আমরা এখন ভোগ করতে যাচ্ছি। লকডাউনের সময় পুরোপুরি সামাজিক দূরত্ব না মানা, স্বাস্থ্যবিধি না মানা, আক্রান্ত এলাকার সাথে যাতায়াত নিরবচ্ছিন্ন রাখার কারণে আমাদের প্রিয় চৌদ্দগ্রাম মৃত্যুপুরীতে রূপ নিলে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আমি এর আগেও করোনা বিষয়ক লেখায় বলেছি, আমাদের বড় সমস্যা আমরা অসচেতন। আমাদের অসাবধানতা আর অসচেতনতাই আমাদেরকে ডুবাচ্ছে। 

চীনে আক্রান্ত হওয়ার পর আমাদের সব চললেও আমরা যদি বিমানবন্দর লকডাউন করে রাখতাম, বিভিন্ন আক্রান্ত দেশ থেকে আসা লোকজনকে সঠিকভাবে একা রাখার চেষ্টা করতাম, আক্রান্তদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করতাম, ডাক্তার নার্সসহ জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের আসল পিপিই সরবরাহ করা নিশ্চিত করতাম, গার্মেন্টস আরো কিছুদিন নিয়ম মেনে বন্ধ রাখতাম, সরকারি সকল নির্দেশনা সঠিকভাবে মেনে নিতাম— তাহলে আজ আমাদেরকে এমন করুণ দশা দেখতে হতো না। এখন আর কি করবেন নিজেদের কর্মফল লাশের মিছিলে গিয়ে ভোগ করুন। নীরব হয়ে প্রিয়জনের পাশে নিজেও লাশ হয়ে নিশ্চুপভাবে ঘুমিয়ে পড়ুন। এমন আয়োজনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন। এর আগে কান্নার রোল দূর থেকে শুনেছেন। এখন খুব কাছ থেকে শুনুন। প্রিয়জনকে অশ্রুসজল হয়ে শুইয়ে দিন শীতল মাটির বিছানায়। আর কাঁদুন সারাবেলা সারাদিন সারাবছর। 

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে লাশ হয়েছে ৫০১ জন। আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার। হিসাব ও পরীক্ষার বাইরে আরো কতজন আক্রান্ত কে জানে? বহু ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, সেনাবাহিনীর সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। আমাদের ভালো রাখতে গিয়ে তারাও ভালো নেই। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান ডক্টর জাফরুল্লাহ নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন! যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র করোনা পরীক্ষার কিট আবিষ্কার করলো সে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীরা আক্রান্ত হলে জাতি কোথায় যাবে। অনেক জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আবিষ্কৃত কিট পরীক্ষার অনুমতি মিলল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ না হলে তাও মিলত না। এখন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে করোনা পরীক্ষা শুরু হয়েছে। তাদের আবিষ্কৃত কিট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ব্যাপক হারে আমরা করোনা পরীক্ষায় কাজে লাগাতে পারব। এটা আমাদের জন্য ভালো খবর। কিন্তু খারাপ খবর হলো ড. জাফর উল্লাহর করোনায় আক্রান্ত হওয়া।

 করোনার দুঃসাহসী সম্মুখ যোদ্ধা ডাক্তার ও নার্সরা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। করোনার যমদূতের সাথে জীবনপণ লড়াই করে তারা আমাদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রাণও হারিয়েছেন কয়েকজন। সবার আগে আমাদেরকে মানবতার সেরা ফেরিওয়ালা ডাক্তার-নার্সদের বাঁচাতে হবে। তাঁরা সুরক্ষিত না থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। আর যদি চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন এ জাতির দুঃখের সীমা থাকবে না। ডাক্তারদের সাথে শত শত পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছেন সেনাবাহিনীর গর্বিত সদস্যরা। বাংলাদেশকে ভালো রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জীবন দিয়ে লড়ছেন। জীবন দিয়েছেন অনেকে। এ আত্মত্যাগ আমরা কিভাবে দেব? কি করে তার প্রতিদান দেব জানি না। শুধু এটা জানি আমাদেরকে বাঁচতে হবে, এ জাতিকে বাঁচাতে হবে।

আমাদের দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাক্ষণ সারাদেশের খোঁজ খবর রাখছেন। ঘুর্ণিঝড় আম্পানের সময় সারারাত নির্ঘুম থেকে তিনি পরিস্থিতির উপর নজর রেখেছেন, সঠিকভাবে জনগুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে লড়ছেন। মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন ত্রাণ। নগদ ঈদ উপহার পাঠাচ্ছেন মোবাইলে মোবাইলে। প্রণোদনা দিচ্ছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে। তিনি সাধ্য পরিমাণ চেষ্টা করছেন দেশকে ভালো রাখতে, দেশের মানুষকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে। মহান আল্লাহ তাআ’লা প্রধানমন্ত্রীর এই আপ্রাণ জীবন দিয়ে জনসেবাকে কবুল করুক। আল্লাহর অশেষ রহমত ছাড়া আমাদের আর বাঁচার উপায় নেই। আমাদের চেষ্টার সাথে মহান আল্লাহর করুণা ও দয়া পেলে ইনশাআল্লাহ আমরা করোনার অন্ধকার থেকে অচিরেই মুক্তি পাব। মেঘকেটে আঁধার সরে ঠিকরিয়ে প্রতিফলিত হবে মুক্তির উল্লাস। সেটা কবে হবে সে অপেক্ষায় রইলাম। এমন মুক্তির মুহূর্ত সারাবিশ্ববাসীর জন্য এ মুহুর্তে বড্ড বেশি প্রয়োজন। আমাদের অশ্রুসজল প্রার্থনা কবুল করে, সৃষ্টিকর্তার কাছে আবেদন রইল আমাদের মুক্তি দেয়ার। তিনি ছাড়া সত্যিকারের রক্ষাকারী, নিরাপত্তা দাতা আর কেহ নেই। 

লেখকঃ সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী :নূরুল আলম আবির