বখাটেরা সমাজের গভীর ক্ষত, এ ক্ষত সারাবে কে?

117
নূরুল আলম আবিরঃ অবহেলায় অনাদরে স্কুল-মাদ্রাসা থেকে ঝরে পড়া একদল কিশোরই একসময় হয়ে উঠে বখাটে। এখনকার সময়ে সমাজে বেড়ে ওঠা কিশোরদের অধিকাংশই মেতে রয়েছে বখাটেপনায়। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থ সভ্যতা-সংস্কৃতি বিকাশের পথে অনেক বড় বাঁধা। বাংলাদেশের আটষট্টি হাজার গ্রামে আপনি চোখ মেলে তাকালে দেখবেন বখাটে ছেলের অভাব নেই। আরো গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখবেন ওদের হাতে বড় বড় স্মার্টফোন, আইফোন ও ল্যাপটপ। এদের অনেকেরই পিতা থাকেন প্রবাসে। প্রবাসী বাবা এসব কিছু আবেগী হয়ে ছেলের জন্য পাঠায়। এগুলোতে ডুবে থেকে একসময় বাবা-মায়ের আদরের খোকাটা পড়াশোনায় হয়ে পড়ে অমনোযোগী। তখন সে গ্রামের আর দশটা বখাটে ছেলের সাথে মিশে শুরু করে ভণ্ডামি আর বখাটেপনা। পিতা প্রবাসে থাকায় মা তার অবাধ্য ছেলেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। একসময় সে বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন এসব ছেলেরা পরিপূর্ণ বখাটে হয়ে নানারকম অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের যৌন হয়রানি করা, তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা বখাটেদের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এছাড়াও ছোটে খাটো চুরি, মারামারি করা এমনকি খুন-খারাবিতেও জড়িয়ে পড়ে তারা। এ বয়সে সংশোধন না হলে প্রাপ্ত বয়সে এরাই হয়ে উঠে সন্ত্রাসী খুনী। গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলো পরিদর্শনে গেলে আপনি দেখবেন সেখানে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের সংখ্যা অনেক কম। বড়জোর শতকরা ৩০ ভাগ হবে। বাকী ৭০ ভাগই মেয়ে। আপনি আরো ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখবেন স্কুলে বহু ছেলে স্মার্টফোন নিয়ে আসে। একটা ক্লাসে যেখানে ১০ টা মেয়ে পড়া দিতে পারে, সেখানে ২ টা ছেলেও পড়া দেয় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েও বখাটে টাইপের ছেলেরা সহপাঠীদের সাথে বিভিন্ন ধরনের ঝামেলায় জড়ায়। আকস্মিকভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে বহু ছেলের গোপন পকেটে মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। সেগুলো বাজেয়াপ্ত করার পরও আপনি অনুসন্ধান চালালে আবারও পাবেন। অর্থাৎ ওরা সংশোধন হয় না। একটা ছেলে বখাটে হওয়ার পেছনে বাবা-মায়ের একটু অবহেলা অনাদরই যথেষ্ট। তাদেরকে সুশিক্ষিত সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে, মাতৃ ও পিতৃ স্নেহের তুলনা নেই। বাবার মার পক্ষ থেকে সকাল বিকাল তদারকি করলে, স্কুলে সাথে করে নিয়ে গেলে, আবার ছুটির সময়  নিয়ে আসলে, একটা ছেলে বখাটে হওয়ার সুযোগ পায় না। তাছাড়া মাদকের ভয়াল থাবা বহু ছেলেকে বখাটে বানিয়ে দিয়েছে। খারাপ বন্ধুদের সাথে মিশে, চোখ বন্ধ করে একটি দুটি গাঁজা ভরা সিগারেটে সুখ টান দিয়ে বহু ছেলেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। তারপর তারা ধীরে ধীরে মদ ও ইয়াবার নেশায় ডুবে থাকে। এভাবেই বহু মূল্যবান জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। এদের অন্ধকার জীবনের প্রভাব পড়ে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে। ওরা হয়ে পড়ে দুঃসাহসী বখাটে। তাদের বখাটেপনা একদিন তাদেরকে সন্ত্রাসী বানায়, খুনী বানায়। এরা সমাজের গহীন ক্ষত। এ ক্ষত খুব সহজে সারে না। যুগের পর যুগ সমাজ ও রাষ্ট্রকে ওরা ভোগায়। আমরা হয়ে উঠি অতিষ্ঠ ও ভোগান্তির শিকার। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সুন্দর স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা দারুণভাবে ব্যাহত হয়। আপনার সন্তানকে সুন্দর ও আলোকিত করে গড়তে চাইলে তাদের সময় দিন। যত্ন নিন। স্নেহের পরশে সকাল সন্ধ্যায় তাদেরকে পড়ার টেবিলে বসান। নিজেও মাঝে মধ্যে বসে তাদেরকে সহযোগিতা করুন। আপনার স্নেহমাখা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আপনার ছেলে একদিন হয়ে উঠবে আলোকিত মানুষ। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝা না হয়ে হবে মহামূল্যবান সম্পদ।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
রচনাঃ ১১ মে, ২০২০ ইং।।