আমাদের ইমাম সমাজ ও কিছু কথা

264

আমাদের ইমাম সমাজ ও কিছু কথা
এম. এ. মাসুদ:

আমাদের দেশের মসজিদের ইমাম, খতিব এবং মুয়াজ্জিনগন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসাবে সমাজে আদৃত। আমাদের সমাজের সর্ব মহলে, এমন কি অন্য ধর্মালম্বীদের কাছেও এসকল পদে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিগন সমাজের গুরুত্ব সম্পন্ন পদাধিকারীর মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে থাকেন। আমাদের সমাজে ইমামদের ধর্মীয় নেতা হিসাবে সম্মান দেওয়া হয় এবং ইসলাম ধর্ম সংশ্লিষ্ট যে কোন বিষয়ে জানার জন্য মানুষ তাঁদের কাছে আসেন। অনেক সময় তাঁরা যে কোন সামাজিক সমস্যা নিরসনে ভূমিকা রাখেন। তাছাড়া দেশ বা সমাজের যে কোন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভূমিকা পালনের জন্য এবং জনস্বার্থ সম্পর্কিত সরকারী কর্মসূচী বাস্তবায়নের কাজে সরকারও তাঁদের সহযোগিতা নিয়ে থাকেন। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আমাদের দেশে ইমাম, খতিব এবং মুয়াজ্জিন সাহেবগন জনগণ এবং সরকারের কাছে সম্মানের এবং গুরুত্বের অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানিত পদে অধিষ্ঠিত ইমাম, খতিব এবং মুয়াজ্জিনগন কতটা অবহেলিত তা অনুধাবনে আমরা চরম ভাবে ব্যর্থ। আমাদের এই ক্ষমাহীন ব্যর্থতার কারণে সারা দেশের মসজিদ সমূহে ইমাম, খতিব এবং মুয়াজ্জিন পদে দায়িত্ব পালনকারী কয়েক লক্ষ মানুষ নিজেদের পরিবার পরিজন নিয়ে কত দীনহীন ভাবে দিন যাপন করছেন তা নিয়ে ভাবার অবকাশ কি কখনো আমাদের হয়েছে ? এসব পদে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিগন আমাদের সমাজেরই অংশ। জীবন ধারনে এবং দিন যাপনে আমাদের যা যা লাগে তাঁদেরও তা-ই লাগে। আমাদের মত তাঁদেরও খিদে পায়। আমাদের মত তাঁদেরও অন্ন¬-বস্ত্র-বাসস্থানের প্রয়োজন আছে। আমাদের সন্তান সন্ততিদের মত তাঁদের ছেলেমেয়েদেরও লেখাপড়া করার জন্য অর্থ লাগে। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবেছি এই বিষয়ে? অল্প সংখ্যক সরকারী অনুদান প্রাপ্ত মসজিদ এবং ধনাঢ্য জনঅধ্যুষিত এলাকার মসজিদ ব্যতিরেকে সারা দেশে মসজিদের ইমাম, খতিব এবং মুয়াজ্জিনদের যে সম্মানী দেওয়া হয় তা এতই নগন্য যে, এখানে তা উল্লেখ করতে আমি বিব্রত, লজ্জা এবং অপরাধ বোধ করছি। আমাদের দেশের মসজিদের পরিচালনা কমিটি গুলো ইমাম, খতিব এবং মুয়াজ্জিনদের যে সম্মানী দিয়ে থাকেন তা দিয়ে ভদ্রভাবে বেঁচে থাকা যায় না। আমি মনে করি, মসজিদ কমিটি গুলো তাঁদের যে সম্মানী দেন তা আমাদের দেশের সরকারী বা বেসরকারী চাকুরীতে নিয়োজিত সর্ব নিম্মপদাধিকারীর বেতনের চাইতেও নিম্মে। তাঁরা সমাজের উদাসীনতা, অবহেলা এবং বঞ্চনার শিকার। তাঁরা যে পদে অধিষ্টিত সে পদের গুরুত্ব ও মর্যাদার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, তাঁদের সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহের জন্য ‘সম্মানজনক সম্মানীর’ ব্যবস্থা করা আমাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।

ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিন পদে নিয়োগ, তাঁদের জন্য সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্মানী এবং উৎসব ভাতা নির্ধারণ, তাঁদের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ইত্যাদি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মসজিদ পরিচালনা কমিটি কর্তৃক অবশ্য পালনীয় বিধিমালা প্রণয়নের জন্য জরুরী ভিত্তিতে সরকার তথা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এ আলোচ্য বিধিমালায় ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিন্নদের নিয়োগের জন্য অন্যান্য যোগ্যতার সাথে নূন্যতম একটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাপকঠির বিষয়টি সংযোজন করতে হবে এবং নিয়োগ লাভের পর ইসলামি ফাউণ্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এক মাসের প্রশিক্ষণ কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। এই কোর্সে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, জনসংখ্যা, ভূগোল, ইতিহাস সহ বিশ্ব অর্থ-সমাজনীতি, ভূগোল, ইতিহাস, মুসলিম বিশ্ব এবং বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ইমাম খতিব, মুয়াজ্জিনদের ধারণা লাভে সহায়ক হয় এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে। বর্তমানে আমাদের দেশের মসজিদ কমিটিগুলো অধিকাংশই পকেট কমিটি অথবা পরিবার বা গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত। এ সকল কমিটির কোন সরকারী অনুমোদন বা স্বীকৃতি নেই। ফলে এসব কমিটির কতিপয় ব্যক্তিদের ইচ্ছা বা মর্জি অনুযায়ী মসজিদগুলো পরিচালিত হয় এবং ইমাম, খতিব বা মুয়াজ্জিনদের তাঁদের স্ব স্ব পদে বহাল থাকা বা তাদের পদচ্যুতি এদে ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে। তাই আলোচ্য বিধিমালায় মসজিদ কমিটি গঠনের পদ্ধতি বিষয়ে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন এবং বিধিমালায় নির্দেশিত পদ্ধতি অনুযায়ী কমিটি গঠন করে তা সংশ্লিষ্ট জেলার ইসলামী ফাউন্ডেশনের অনুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা জারী করা প্রয়োজন।

এটি একটি অত্যন্ত জরুরী গুরুত্ব সম্পন্ন মানবিক বিষয়। সারাদেশের মসজিদগুলো যাতে সুষ্ঠু ভাবে পরিচালিত হয় এবং সকল মসজিদের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনগণের সম্মানজনক জীবন যাপনের বিষয় নিশ্চিত করার জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। ধর্মমন্ত্রণালয় ইসলামী ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এবং দেশের খ্যাতনামা আলেমগণের মতামত নিয়ে এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেন। যেহেতু এ সকল মসজিদের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী দেওয়ার দায়িত্ব মসজিদ কমিটির যেহেতু এ বিষয়ে সরকারী কোষাগার থেকে অর্থ ব্যয়ের কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের একটুখানি উদ্যোগ সারা দেশে ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের এবং তাঁদের উপর নির্ভরশীল পরিবারে কয়েক লক্ষ সদস্যের জীবন যাপনে সাচ্ছন্দ নিয়ে আসবে। এ বিষয়ে ভাবা এবং বিষয়টি সুরাহার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবী।

লেখক : সমাজকর্মী।