লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে বোরো চাষে ব্যস্ত নওগাঁর চাষীরা

74

রুহুল আমিন: লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে নওগাঁয় ইরি-বোরো চাষবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষীরা। এ বছর শীতের মৌসুমে কয়েক দফা বৃষ্টি, ঘন কুয়াশা, শীত ও আবহাওয়া বিপর্যয়ে বীজতলা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় দেরীতে শুরু হয়েছে চাষাবাদ। কৃষকরা বলছেন, বর্তমানে তাদের ঘরে ধান নাই। বাজারে যেটুকু ধান বিক্রি হচ্ছে তা বড় বড় জোদ্দার ও ব্যবসায়ীদের। সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনলেও তা পর্যাপ্ত নয়। আগামী দিনে আরো বেশি পরিমাণ ধান সরাসরি কৃষকের নিকট থেকে কিনলে অনেকটা লাভবান হবেন বলে জানান তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছর (২০১৯) বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এ বছর ১ লাখ ৮০ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হচ্ছে। চলতি (২০১৯) রোপা-আমন মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছিল।

উত্তরাঞ্চলের মধ্যে ধান-চাল উৎপাদনের খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা নওগাঁ। গত কয়েক বছর থেকে ধানের আবাদ করে লোকসানে পড়েছেন চাষীরা। গত বছর বোরো ধান ঘরে উঠার আগেই ফনীর প্রভাবে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ধান মাটিতে পড়ে যাওয়ায় ফলন বিঘা প্রতি ৫-৭ মন কম হয়েছিল। একদিকে ধানের উৎপাদন কম, অন্যদিকে শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধি এবং বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিল কৃষকরা। প্রতি বিঘা জমিতে আবাদ করতে ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকা খরচ হয়। বিঘা প্রতি ফলন হয়েছিল ১৫-১৯ মন। ছোট কৃষক ও বর্গদাররা ধারদেনা করে আবাদ করে থাকেন। যার কারণে ধান কাটার পর ঘরে উঠার আগেই বাজারে বিক্রি ঋণ পরিশোধ করতে হয়। এতে করে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাওনা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। আবার বড় কৃষকরা ঘরে ধান সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন। যার কারণে তারা ধানের দাম বৃদ্ধির সময় বিক্রি করে কিছুটা লাভবান হন।

অপরদিকে, সার, ঔষধ ও কাটা মাড়াইসহ আমন ধানের আবাদ করতে প্রায় ৮-৯ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে থাকে। এবছর ফলনও ভাল হয়েছে। বিঘা প্রতি প্রায় ১৮-২২ মণ। প্রথম দিকে কারেন্ট পোকার আক্রমন দেখা দিলেও পরে কীটনাশক প্রয়োগে রক্ষা পায়। সরকার ২৬ টাকা কেজি দরে আগাম আমন ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে খোলা বাজারে দাম নিয়ে সারা বছরই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কারণ চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম। তাই বাধ্য হয়ে কৃষকদের খোলা বাজারে কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়। বাজারে যে ধান বিক্রি হচ্ছে তা জোদ্দার ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের। বলতে গেলে কৃষকদের ধরে ধান নাই। তারা আগেই ধান বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে করে প্রতি বছরই কৃষকদের ধানের ন্যায্য দাম পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। বর্তমানে বাজারে জিরাশাইল ১ হাজার ৩০-৪০ টাকা, কাটারি ১১শ-১১৫০ টাকা, চিনিগুড়া ১৯শ-১৯৫০ টাকা, আমন ধানের দাম স্বর্ণা-৫, ৭২০-৪০ টাকা। গত ১৫ দিনে প্রতি মণ ধানে ৫০-১০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে ইরি-বোরো চাষবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন চাষীরা। এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই আবহাওয়া বিপর্যয় ঘটেছে। এতে ইরি-বোরো চাষবাদের জন্য রোপনকৃত অতিরিক্ত শীতে বীজতলা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অপরদিকে আবহাওয়া অনুকুলে না থাকায় জমি সেচ, হাল চাষ ও রোপন করতে দেরি হয়েছে। গত কয়েকদিন থেকে আবহাওয়া কিছুটা অনুকুলে থাকায় জমি সেচ, হালচাষ ও রোপনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন চাষীরা।

বদলগাছী উপজেলার ভাতশাইল গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান চৌধূরী বলেন, বর্তমানে আবহাওয়া অনুকুলে আছে। পানি সেচ ও হাল চাষ করে জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত শীতের কারণে বীজতলা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। পরে আবারও বীজ রোপন করতে হয়েছে। যার কারণে জমি রোপনের কাজ কিছুটা ধীর গতিতে হচ্ছে।

নওগাঁ সদর উপজেলার জোকাবিলা গ্রামের কৃষক এনামুল হক লিটন বলেন, দিঘলী বিলে প্রতি বছর প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করে । এই বিলের কয়েক হাজার বিঘা জমিতে বছরে শুধুমাত্র এই একটি আবাদ হয় সেটা বোরো ধান। যদি কোন দূর্যোগ হয় তাহলে কৃষকদের সর্বস্বান্ত হতে হয়। গত ৩ বছরে না প্রতিকুলতায় প্রচুর লোকসান হওয়ায় এবার লোকসানের বিষয় মাথায় নিয়েও ২০ বিঘা জমিতে নিজে আবাদ করে বাকীগুলো বর্গা দিলাম।

বদলগাছী উপজেলার চাকরাইল গ্রামের কৃষক আলতাব হোসেন বলেন, লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে বোরো আবাদ শুরু করেছি। গত বছর বোরো ধানের আবাদ করতে গিয়ে খরচ বেশি ও ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। সরকার যে ধান কিনছেন তা পর্যাপ্ত না। যার কারণে খোলা বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হয়। জমিতো আর ফেলে রাখা যাবে না। তাই বাধ্য হয়ে ধানের আবাদ করতে হচ্ছে। তবে সরকারের উচিত কৃষকদের ধানের দাম দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা। বেশি পরিমাণ ধান কিনলেও কৃষকরা উপকৃত হবেন বলে আশাবাদী।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ) মো: মাহবুবার রহমান বলেন, বর্তমানে আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ধান রোপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ জমি রোপন হয়েছে। প্রথমদিকে আবহাওয়া কিছুটা বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। শীতের কারণে বীজতলা সামান্য ক্ষতিগ্রস্থ হলেও কৃষকরা পরবর্তীতে পুশিয়ে নিয়েছেন। লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশাবাদী।