একুশ তুমি বেদনাহত স্থায়ী নিভির গাঙচিল

73

শাহাদাৎ হোসেন শিপন: মানবসৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ মনের ভাব প্রকাশে শ্রেষ্ট মাধ্যম হিসাবে ভাষাকে বেছে নিয়েছে মানুষের বৈচিত্রময় ভাষার বব্যহার আমাদের জানিয়ে দেয় সামাজিক অবস্থান,ধম,বর্ণ, জাতি,লিঙ্গ, শ্রেণী বয়স ইতাদি। লিঙ্গ পার্থক্যর কারনে এই পৃথিবীতে সব ছেলে ও মেয়ের পরিবেশ,পটভুমি,অভিজ্ঞতা আলাদা হয়। সমাজতত্ব ও মনস্তত্বর ব্যাখা মতে নারী ও পুরুষের মূল্যেবোধ ,সামাজিক ,পারিবারিক দায়বোধ ,সামাজিক মর্যাদা,ক্ষমতা,দৃষ্টি ভঙ্গি আলাদাভাবে গড়ে উঠে। ফলে ভাষা হয়ে উঠে মানুষের সামাজিক পরিচয়ের প্রধান বাহক।

ভাষা হলো আত্বার আয়না। যার মাধ্যমেই মানুষ স্বনির্ভর সংকেত ধর্মীয় প্রকাশ ঘটিয়ে সামাজিক লেনদেন করে থাকে। তেমনি মায়ের ভাষায় কথা বলা একজন মানুষের জন্মগত অধিকার। সেই অধিকার কেহ যদি কেড়ে নিতে চায় অথবা জোর করে অন্য ভাষায় কথা বলতে বাধ্য করার অপচেষ্টা চালায় তা কোন জাতি মেনে নিতে পারেনি,পারবে ওনা। ভাষার জন্য ভালোবাসার জায়গা হতে শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই এবং প্রাণের বিনিময়ে মায়ের ভাষা রক্ষা করার এমন বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস বিশ্বের কোনো দেশেই নেই। ভাষার জন্য আন্দোলন এবং জীবন বিলিয়ে দেওয়ার অনন্য এক ইতিহাস রয়েছে বাঙালীর ।

বাঙালীর জীবনের ভাষা,সাহিত্য ,সমাজ ,সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যা কিছু গৌরবময়তা যেন মহান একুশে একাকার। জনপদ নদীনালা,গাছগাছালি,আকাশ বাতাস ,প্রকৃতি সবকিছুতেই রয়েছে একুশের ছায়া। সেই পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হয়ে চলছে।

ভাষা আন্দোলনের পূর্ববতী বা পরবর্তী সময় বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে বসানোর জন্য বঙ্গবন্ধুর মতো এতটা কার্যকরী ঊদ্যোগ গ্রহন করেনি সমাজ বা রাষ্টের নিতি নির্ধারকেরা। উর্দূ ভাষাম্বলী পাকিস্তানের দুয়োরাণীর মর্যাদা থাকা বাংলাকে সুয়োরাণীর আসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন আমৃত্যু পর্যন্ত। যার সুচনা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নিজ নিজ অবস্থানের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন হওয়ার পর। সে বছর গণতান্ত্রিক যুবলীগ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। যাতে করে ভাষা বিষয়ক বেশ কিছু প্রস্তাব গৃহিত হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলনে বাংলা বিষয়ক একটি প্রস্তাব করেন ,বাংলা ভাষাকে পুর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক।

বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে উত্তির্ণ করা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম উদ্যোগ। একই বছরে ৫ ডিসেম্বর খাজা নাজিমুদ্দি বাসভবনে মুসলিমলীগের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং চলাকালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার মিছিলে নেতৃত্ব দেন।পরের বছর অর্থ্যাৎ ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্বক হরতালে পুলিশী নির্যাতনের পর প্রথম গ্রেফতার হন শেখ মুজিব ।৪ দিন কারা ভোগের পর ১৫ মার্চ মুক্তি পেয়ে ১৬ মার্চ ভাষা আন্দোলনেকে বেগবান করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সাধারণ ছাত্র সভার সভাপতিত্ব করেন তিনি। ৪৭’এর ডিসেম্বর মাসে শেখ মুজিবসহ ১৪ জনভাষা প্রেমিক বাংলা ভাষার আন্দোলনসহ বিভিন্ন দাবি সংবলিত ২১ দফা ইশতেহার প্রণয়ন এবং তা পুস্তক আকারে প্রকাশ করা হয় ।

যার নাম করন করা হয় “ রাষ্ট্রভাষা ২১ দফা ইশতেহার ঐতিহাসিক দলিল”। শেখ মুজিব তমুদ্দিন সম্মেলনে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবংএর পক্ষে গণস্বক্ষর আদায় করেন।পরের বছর আন্দোলন জোরদার করার অভিযোগে আবারও গ্রেফতার হয়ে জেলে বসে নিয়মিত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য সংগ্রামী ভাইদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন ও পরামর্শ দিতেন।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পূর্ব বাংলার যখন পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হলো তখন বাঙালীর অর্থনৈতিক অধিকার ,সামাজিক এবং সংস্কৃতির অধিকার সমূহ রক্ষা হবে বলেই ধরে নিয়েছিল,কিন্তু সেই ঔপনিবেশিক শাসক গোষ্টি বাংলা সংস্কৃতি কে স্বকৃতিতো দিলোই না বরং নাকচ করে দিল।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের মহানায়ক জিন্নাহ ঢাকায় এসে দাম্ভিকস্বরে ঘোষনা দিল উর্দূই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাৎক্ষনিকভাবে জানিয়ে দিল -তার এই হুকুম কোন ভাবেই মানা হবেনা , জিন্নাহর এমন দম্ভভরা ভাষণ কোনো দৃষ্টতার ব্যাপার ছিলনা,আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিকে দূর্বল করার চতুর পরিকল্পনা। ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে এক সামাজিক আন্দোলনের সূচনা হলো। ১৮৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত বহুঘাত প্রতিঘাত তৈরী হলো কিন্তু বাংলা ভাষার মান রক্ষার স্বার্থে বহু মনিষি ,পন্ডিতসহ সর্বস্তরের শিক্ষিত,অর্ধশিক্ষিতসহ আপাময় জনগন ফুঁসে উঠলো। দেশের আনাচে কানাছে শ্লোগানে মুখরিক রাষ্ট্র ভাষারাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই বাংলা চাই।

১৯৫২ সালে ২১ শে ফেব্রুয়ারী সেই রক্তস্নাত গৌরবের সুর বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের ১৯৩ টি দেশের মানুষের প্রানে অনুসরনিত হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন উদ্যোগের ফল স্বরূপ ১৯৯৯ সালে ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ শে ফের্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সারা বিশ্বের সকল নাগরিকের সত্য ও ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রেরনার উৎস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।