নারীদের চোখের জল কে থামাবে?

61
নূরুল আলম আবির: আমাদের সমাজে নারীরা এখনো বড্ড অসহায়। চোখের জলে অজস্রবার স্নান করে তাদের পরম যত্নে লালিত হীরক স্বপ্নগুলো। বাবা-মায়ের কলিজার টুকরো এসব মেয়েদের অনেকেই শ্বশুর বাড়িতে নির্যাতিত হন হরহামেশাই। ধর্ষণ, ইভটিজিং এর কথা তো বলে শেষ করা যাবে না। এক জরীপে দেখা গেছে, ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীদের বিচার পাওয়ার হার মাত্র সাড়ে তিন পারসেন্ট। এদের মধ্যে বহু নারী ভয়ংকরভাবে ধর্ষিত ও নির্যাতিত হবার পরও মামলা করার সাহস করে না। পরিবারের আত্মসম্মান, সামাজিক অবস্থান আর অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেকেই চুপ থাকতে বাধ্য হয়। বিয়ের সময় প্রায় ৯০ ভাগ মেয়েদের মতামত নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না আমাদের এ সমাজ। ছেলেটা কতটুকু যোগ্য? তার ব্যক্তিগত জীবন কেমন? সে কি মাদকসেবী? তার রুচি, সংস্কৃতি ও জীবন চর্চার সাথে হবু বরটার কতটুকু ম্যাচিং হবে? —এসব না জেনে অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদেরকে হাত-পা বেঁধে জবাই করা গরুর মত স্বামীর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে স্বামীর খেদমত, ননদের আবদার, শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সেবা করা, রান্না-বান্না করা এবং তার আপন ঠিকানা পরিবারের পাহাড়সম অজস্র কাজের মধ্যে রয়েছে ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা। এরমধ্যে আরো আছে— বড় জা এর আদেশ, ছোট জা এর অনুরোধ আবদার অভিমান ইত্যাদি ইত্যাদি। এতসব দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে, প্রতিটি মুহূর্ত কাটে এ দেশের নারীদের। এর মধ্যেও যদি তার উপর স্বামী ও শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর নির্যাতন ও উৎপীড়ন যোগ হয়, তখন এই হতভাগ্য মেয়েটির জন্য এই পৃথিবী হয় প্রজ্জ্বলিত নরক। এ নরকে জ্বলে জ্বলেও সে সংসার করে। একসময় যখন তার দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। তখনই কেমল বিচ্ছেদের কথা ভাবতে হয় তাকে। বিচ্ছেদের কথা মনে হতেই হৃদয়ের ক্যানভাসে, চোখের তারায় খেলা করে তার অতি আদরের খোকাখুকুরা। মোড়চ মারে কলিজায়। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় তার সারা জীবনের স্বপ্ন। এসব কিছু ভাবতে ভাবতেই মনের অজান্তে অশ্রু জমে উঠে তার টানাটানা কাজল চোখের ছোট্ট কোঠরে। বুক ভাসে, স্বপ্ন ভাসে সীমাহীন কষ্ট বহন করা অশ্রুর বন্যায়। ঠিক সে মুহুর্তে স্বামীসহ শ্বশুর বাড়ির সবাই তার দুশমনে পরিণত হয়। তারা সবাই অবলা এই নারীকে প্রতি মুহুর্তে হাড় ভাঙা নির্যাতন করে। গভীর রাতে চোখের জল ছেড়ে নীরবে কাঁদে একমাত্র বাবা-মায়ের অতি আদরের খুকিটি। স্বামীহীন শুন্য বিছানায় ফুলের মত সুন্দর কলিজার টুকরো সন্তানগুলোর মায়াবী মুখগুলো তাকে বারণ করে। তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না, মা। তুমি চলে গেলে আমরা বাঁচব কি করে? ঘুম পাড়ানি গান শুনিয়ে আমাদের ঘুম পাড়াবে কে? স্নেহসুধার চুম্বন এঁকে, আমাদের মুখে খাবার তুলে দেবে কে? এ অবস্থায় কোনো মা তার সন্তানদের ছেড়ে যেতে পারে না। এভাবে না যেতে পারা মেয়েগুলো কষ্টের অনলে প্রথমে সিদ্ধ হয়। তারপর জ্বলতে জ্বলতে একসময় ছাঁই হওয়া ভস্মের মত জ্বলে পুঁড়ে ছারখার হয়। এতকিছুর পরও ওরা যায় না। থেকে যায় সন্তানের মাথার ছায়া হয়ে, তাদের পরম আপন বন্ধু হয়ে। এদের মধ্যে কিছু কিছু নারী পথ ধরে পিতার ভিটায়। কখনো সন্তানসহ, কখনো আবার ছেলে সন্তানদের সাথে করে। তখন সকল বোঝা এসে পড়ে অসহায় পিতার নড়বড়ে ঘাড়ে। কারো কারো ঠাঁই হয়, পঙ্গু বা বেকার পিতার ব্যথার মিছিল করা হৃদয়ে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৭৩২ জন। গত বছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ যা খুবই ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী। ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে। আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৭০ জন। ২০১৯ এ যৌন হয়রানীর শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। ২০১৯ সালে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৬৭ জন নারী। তাদের মধ্যে নির্যাতনে নিহত হন ৯৬ জন এবং আত্মহত্যা করেন তিনজন। আর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ৪২৩ জন নারী। ২০১৯ সালে ২০০ জন নারী তাদের স্বামীর হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭৩ জন। ১৯৯৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নারী নির্যাতনবিষয়ক ঘোষণায় বলা হয়, নারীর অধিকারগুলো হবে : জীবনের অধিকার, সমতার অধিকার। স্বাধীনতা ও ব্যক্তি নিরাপত্তার অধিকার। আইনের দৃষ্টিতে সম-নিরাপত্তার অধিকার। সব ধরনের বৈষম্য থেকে মুক্ত হওয়ার অধিকার, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সেবা লাভের অধিকার। ন্যায্য ও অনুকূল কর্মপরিবেশের অধিকার। কোন ধরনের নির্যাতন অথবা অমানবিক নিষ্ঠুর আচরণ অথবা অধস্তন দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন আচরণ ও শাস্তি না পাওয়ার অধিকার। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলধারায় নারীকে যুক্ত করার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন নারীর সব ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে মুক্ত হওয়া। অথচ বাস্তবতার সঙ্গে এই ঘোষণার কোন মিল নেই, আছে শুধু হতাশা আর নির্যাতিত পরিবারের হাহাকার। এ হাহাকার আর্ত চিৎকার করে প্রতিদিনই বিদীর্ণ করছে আমাদের মানবিক হৃদয়। নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণ বিচারহীনতা। ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটে তার একটি অংশ জানা যায় না। এ বিষয়ে কোন মামলা হয় না। আর যেগুলোর মামলা হয় বিশেষ করে ধর্ষণের ক্ষেত্রে সেখানে শতকরা মাত্র তিন ভাগ ঘটনায় শেষ পর্যন্ত অপরাধী শাস্তি পায়। আর ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় শাস্তি হয় মাত্র শূন্য দশমিক তিন ভাগ। তাহলে বোঝা যাচ্ছে এ ধরনের কোন ঘটনায় বিচার হয় না। যারা ধর্ষক তারা ধর্ষণের শিকার নারীর চেয়ে শক্তিশালী। অন্যদিক বাদ দিলেও লৈঙ্গিকভাবে পুরুষ শক্তিশালী। তারা সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবেও শক্তিশালী।, ঘরে, বাইরে, কর্মক্ষেত্রে, যানবাহনে প্রতিদিন নির্যাতন, নিপীড়ন, যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে অসংখ্য নারী। এসব ক্ষেত্রে প্রায় ৭০ ভাগ ঘটনায় মামলা হয়না, বিচার হয় না। ফেনীর নুশরাত হত্যার ঘটনাটা আমরা একটা জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারি। ফেনীর সোনাগাজী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা নুসরাতকে যৌন হয়রানি করার আগে এরূপ আরো অসংখ্য ঘটনা ঘটিয়েছেন। নিজ মাদ্রাসার ছাত্রীদের ধর্ষণ করতে, শ্লীলতাহানি করতে মাদ্রাসার দ্বিতীয় তলায় তার অফিস কক্ষটি ছিল একটি টর্চার সেল। এখানে প্রতিদিন একাধিক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ বা অন্যান্যভাবে হেনস্থা করা হত। বহু মেয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে নীরবে চেপে গেছে এরূপ অসংখ্য ঘটনা। তার পেছনের কারণ ছিল স্পষ্ট ও স্বাভাবিক। ধর্ষকরা ছিল শক্তিশালী। নুসরাত জীবন দিয়ে সে নরক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে গেছে। মেয়েটি তার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং সেই লম্পট অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করে। এই মামলাই কাল হয় তার। আলিম পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে নুশরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তার বুকের উড়না দিয়ে হাত ও পা বেঁধে শ্মশানের লাশ পোড়ানোর মত মেয়েটির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়া হয়। প্রজ্জ্বলিত আগুনে দগ্ধ হতে হতে তার হাত ও পায়ের বাঁধন খুলে গেলে সে জীবন বাঁচাতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষা কেন্দ্রে  দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য তাকে হাসপাতালে ভর্তি করায়। আর তখনই পুরো ঘটনায় চোখ পড়ে সবার। এর কিছুদিন পর মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে না ফেরার দেশে চলে যায়, ফেনীর সাহসী মেয়ে নুশরাত জাহান রাফি। আমরা কিন্তু তার কাছে অপরাধী হয়ে রইলাম। কারণ আমরা তাকে নিরাপত্তা দিতে পারিনি। এ সুন্দর পৃথিবীতে সুন্দর হয়ে জন্ম নেয়া তার অপরাধ নয়। বরং নিরাপদ থেকে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা ছিল তার মৌলিক অধিকার। তার এ অধিকার হরণ করা হয়েছে। মধ্যযুগে জীবন্ত নারী শিশুকে মাটি চাপা দিয়ে হত্যার ঘটনাকেও লজ্জা দিয়েছে নুশরাত হত্যাকান্ড। আমাদের সমাজ এখনো নারী বান্ধব নয়। বরং তা দিনদিন ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে তা মোকাবেলা করা না হয়, তবে এ সমাজে আমার বোন, আপনার বোন চিরকালই নির্যাতনের শিকার হতে থাকবে। এ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার। এর জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো মানবিক হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিটি নারী নির্যাতনের ঘটনায় প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে; আমাদের বঙ্গ ললনারা হবেন অনেকটাই নিরাপদ। নারীর ক্ষমতায়ন বাড়বে। সমাজে, রাষ্ট্রে যোগ হবে নারীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সমাজের অর্ধাঙ্গিণী নারীদের এগিয়ে নিতে না পারলে হোটচ খেয়ে পড়বে আমাদের এগিয়ে চলার হীরক স্বপ্ন, এদেশকে উন্নত বাংলাদেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার দূরন্ত বাসনা হেরে যাবে সবার সম্মুখে।
লেখকঃ
কবি, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী,
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ইং।