যুব বিশ্বকাপের মহারাজা বাংলাদেশ

106

নূরুল আলম আবির: এইতো কিছুদিন আগে গোলাপী বলের টেস্টে যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্স করে ভারত থেকে বিশাল এক চাপের বোঝা নিয়ে ফিরে আসে জাতীয় দলের টিম টাইগার। ইনিংস ও বিশাল রানের ব্যবধানে হেরে আমাদের বঙ্গদেশকে ক্রিকেটের অনুর্বর ভূমি হিসেবে প্রমাণ করলো তারা। পক্ষান্তরে ভারতকে বিশ্বের কাছে ১ নম্বর ক্রিকেটবোদ্ধা স্বীকার করে পরাজয় মানল খুব সহজে। সেই ম্যাচে আমাদের দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা সেখানে গিয়েছিলেন সেই ঐতিহাসিক গোলাপী টেস্ট উদ্বোধনের জন্য। ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের নতুন সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি আমাদের দেশরত্নকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে ম্যাচ উদ্বোধন করে খেলা দেখেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। একের পর উইকেট পড়ছিল টাইগার বাহিনীর উইকেট। ওরা কি ক্রিকেট খেলছিল নাকি উইকেট বিলিয়ে হাসছিল? ঠিক যেন বুঝে উঠা যাচ্ছিল না। সেই ভারতের অনুর্ধ্ব-১৯ দলকে বিশ্বকাপের মঞ্চে হারিয়ে তরুণ-যুবা ক্রিকেট সৈনিকেরা প্রমাণ করল, ভারত নয় আমরাই সেরা। দেশপ্রেম হৃদয়ে ধারণ করে দুঃসাহসী সেনাপতির মত লড়াই করতে পারলে শুধু ভারত নয় সমগ্র ক্রিকেট মুল্লুকেও আমরা সেরা হতে পারি। আমাদের সবচেয়ে বড় চমক আকবর আলী। যুব বিশ্বকাপ জয়ের মহারাজা। দলের রাজাকে কেমন হওয়া উচিত, তা যেন একেবারে আঙুল উঁচিয়ে বিজয় এনে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিলেন তিনি। একই দিন জাতীয় ক্রিকেট দল পাকিস্তানের কাছে ইনিংস ও রানের বড় ব্যবধানে হারে। এই যখন বুড়ো ক্রিকেটারদের হাল হাকিকত, তখন বিশ্বজয় করে আমাদেরকে শিরোপা উপহার দিলেন অনুর্ধ্ব-১৯ যুবা ক্রিকেট দল। বরফের চেয়েও ঠান্ডা মানসিকতার সাথে ইস্ফাত কঠিন ধৈর্য না হলে যে সেরা অধিনায়ক হওয়া যায় না; তা চমৎকারভাবে প্রমাণ করল আমাদের মহারাজা আকবর। ফাইনাল সেরা আকবর আলী যোগ্য সেনাপতির ন্যায় সব দায় ও দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে অবিরাম ছুটেছেন মহাগৌরবের মঞ্চে। হৃদয় তোলপাড় করা রোমাঞ্চকর ও গৌরবময় এ যাত্রায় যোগ্য দলনেতার দায়িত্ব পালন করেন আমাদের তরুণ স্বপ্ন শিকারী আকবর আলী। এর আগে ক্রিকেটের যেকোনো সংস্করণে এমন বিজয় গাঁথা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি বাংলাদেশ। টসে জিতে শুরুতে ফিল্ডিং নেয় বাংলাদেশ। ব্যাটিংয়ে নেমে বিপর্যয়ে পড়ে টিম ইন্ডিয়া। সব উইকেট হারিয়ে ৪৭ ওভার ২ বল খেলে ১৭৭ রান সংগ্রহ করে ভারত। এমন মামুলি স্কোর জেতাও যে সুকঠিন হবে তা কে জানত? বঙ্গ সেনারা ব্যাটিংয়ে নামে। দশ ওভার না পেরুতেই দুই ওপেনার অর্ধশত হাকায়। মাত্র ৮ ওভার ৫ বলে দলীয় হাফসেঞ্চুরি তুলে নেন সাহসী ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন ও তানজিদ হাসান। তখন মনে হচ্ছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর মাত্র কয়েক ওভারের ব্যাপার। তার মাত্র কয়েক বলের ব্যবধানে ১, ২, ৩ উইকেট করে বাংলাদেশ হারাল একে একে ৫ উইকেট। এরমধ্যে রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে ফিরে যান পারভেজ হোসেন ইমন। চরম কোণঠাসা হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। ঠিক এমন বিপর্যয়কর ঝড়ের সময় বুক চিতিয়ে দাঁড়ান স্বপ্নের ক্যাপ্টেন আকবর আলী। শামীম হোসেন (৭) ও অভিষেক দাস (৫) এমন মুহূর্তে দলরাজাকে সঙ্গ দিতে ব্যর্থ হন। ভারতীয় স্পিন ঝড়ে উড়ে যান তারা। হিমালয়ের মত সুকঠিন শক্ত ও দাপুটে প্রত্যয় নিয়ে ত্রাতা হয়ে থেকে যান আমাদের স্বপ্নরাজা আকবর আলী। এক একটি রান করার সাথে সাথে তখন যেন এক একটি শক্ত বাঁধার দূর্গ পেরুচ্ছে বাংলাদেশ। যেতে যেতে ৭ উইকেট গেল। তখনও ক্রিজে আকবর আলী ও রাকিবুল। ড্রপ বল খেলতে খেলতে এক সময় মনে হচ্ছিল ওরা রানবিহীন ক্রিকেট খেলছে। এটা ছিল কঠিন মুহূর্তে শক্ত হাতে হাল ধরার মুহূর্ত। এ সময় একটু আধটু ভুল মানে ১৬ কোটি বাঙালির বিশাল একটি স্বপ্নের নির্মম সমাধি। না। সে সমাধি হতে দিল না আমাদের আকবর আলী আর সাথের স্বপ্নসারথি। এমন টান টান উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার স্বপ্নের ফাইনালে হানা দিল মহাবিরক্তির বৃষ্টি। যার কারণে বন্ধ হয়ে যায় খেলা। কিন্তু ততক্ষণে স্বপ্নের বন্দরে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। যুবা টাইগারদের রান তখনও সাত উইকেটে ১৬৩। ৫৪ বলে তখন দরকার আর মাত্র ১৫ রান। ডার্ক লুইস পদ্ধতিতে তখনও দুঃসাহসী বাংলাদেশ ১৮ রানে এগিয়ে ছিল। বৃষ্টি শেষে আবারো ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। বৃষ্টি আইনে যুব টাইগারদের তখনও দরকার ৩০ বলে ৭ রান। সেই রান নিতে কোনো বেগ পেতে হয়নি জয়ের নেশায় মত্ত বাংলাদেশকে। আকবরের ৪৩ এবং রাকিবুলের ৯ রানের ইনিংসে ভর করে খুব সহজেই জয়ের মঞ্চে পৌঁছে যুবা টাইগাররা। সারা বিশ্বের ছানাবড়া চোখগুলো তখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না! ক্রিকেট মোড়ল ভারতকে হারিয়ে দিয়েছি আমরা! তাও আবার একেবারে বিশ্বকাপের সেরা আসরে। সেয়ানে সেয়ানের ফাইনালে, সেরা সেয়ানার মুকুট জেতে আমার বাংলাদেশ। ইস্পাত কঠিন ধৈর্য, সঠিক দায়িত্ববোধ আর দেশপ্রেমে মত্ত তরুণ রাজারা আমাদেরকে এনে দিল গৌরবগাঁথা মুকুট। বিশ্বজয়ের মুকুট। ক্রিকেট ইতিহাস লেখা হলো নতুনভাবে, নতুন আঙ্গিকে। সেই ইতিহাসের সোনার অক্ষরে লেখা— যুব বিশ্বকাপের মহারাজা খ্যাত চ্যাম্পিয়ন আমার বাংলাদেশ।।

লেখকঃ
কবি, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০।।