ফরিদপুরে আ’লীগ নেতা বন্ধ করে দিলেন ডেল্টা প্ল্যানের খাল খনন কাজ

108

বিপ্লব আহমেদ: ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির নির্দেশে বন্ধ হয়ে গেছে ডেল্টা প্ল্যানের অধীনে চলা একটি খাল খননের কাজ। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে এই কাজ শেষ করতে না পারলে যেটুকু কাজ হয়েছে তাও নষ্ট হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা তাদের। জানা গেছে, ডেল্টা প্ল্যানের অধীনে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় চরভদ্রাসনের পদ্মা নদী থেকে আড়িয়াল খাঁ নদের সংযোগ খাল পুনঃখনন করতে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে চলতি বছর প্রায় ৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে হরিরামপুর ইউনিয়নে পদ্মা নদী থেকে জাকিরের সুরা হয়ে পার্শ্ববর্তী রামনগরে আড়িয়াল খাঁ নদ পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার খালটি খননের কাজ পায় মেসার্স নূর এন্টার প্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর থেকে তারা এক্সেভেটর মেশিন দিয়ে খাল খননের কাজ শুরু করে। প্রায় দেড় কিলোমিটার খননের পর গত ২৯ জানুয়ারি রাতে কাজটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এক্সেভেটর চালক নাসির মোল্যা, আনোয়ার হোসাইন ও সাইটের সাব-কন্ট্রাক্টর জিন্নাত ফকির অভিযোগ করেন, ২৯ জানুয়ারি রাতে চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ খান দলবল নিয়ে এসে তাদেরকে কাজ বন্ধ রাখার জন্য শাসিয়ে যান। এ সময় তাদেরকে হুমকি-ধামকি দেয়া হয় এবং নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। জিন্নাত ফকির জানান, কাজ বন্ধ থাকলেও পাঁচটি এক্সেভেটর মেশিন বাবদ প্রতিদিন তাদের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা গচ্ছা যাচ্ছে। যতদিন এই কাজ শুরু না হবে ততদিন ক্ষতির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে। মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. ইকবাল হোসেন জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করতে না পারলে বর্ষা মৌসুমে এই কাজ করা সম্ভব হবে না। কারণ তখন পদ্মার পানি বেড়ে যাবে এবং খালে পানি থাকার কারণে খনন কাজ করা যাবে না। এতে যেটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে তাও নষ্ট হয়ে যাবে।

জানা গেছে, উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কালাম আজাদসহ ২১ জন বাদী হয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পাউবো ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, জেলা প্রশাস, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সহ ১৫ জনকে বিবাদী করে একটি রিট করেন। এ প্রেক্ষিতে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ ২৯ জানুয়ারি শুনানি শেষে রিটকারীদের সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেন। যদিও উচ্চ আদালত খাল খননের এই কাজ বাস্তবায়নে কোনো স্থগিতাদেশ দেয়নি। তবে উচ্চ আদালতের আদেশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা না করেই উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কালাম আজাদ রাতের আঁধারে দলবল নিয়ে এসে কাজটি বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। এ ব্যাপারে চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খাল খননের কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেননি বলে দাবি করেন। তিনি জানান, তারসহ আরও অনেকের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি রয়েছে ওই খালে। তাদের ক্ষতিপূরণের জন্য এলাকাবাসী কাজটি বন্ধ করে দিয়েছে।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয় থেকে খালের জমি চিহ্নিত করে লাল পতাকা টানিয়ে দেয়ার পর খনন প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। যখন ওই লাল পতাকা টানানো হয়েছিলো তখনই তারা আপত্তি জানাতে পারতো। কিন্তু এখন কাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শেষ হওয়ার পর এভাবে কাজ বন্ধ করে দেয়া মানে প্রকল্পটির ভবিষ্যতই অনিশ্চিত করে দেয়া। এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপকালে তারা স্থানীয় কৃষি ও নৌ যোগাযোগসহ নানা সুবিধার্থে খালটি খনন করা জরুরি বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। মো. মোসলেমউদ্দিন খান নামে সাবেক একজন ওয়ার্ড মেম্বার বলেন, দীর্ঘদিনের এই খালটি ভরাট হয়ে গিয়েছিল। এখন পুনঃখনন করা হলে এলাকাবাসী এতে ব্যাপক উপকৃত হবে। ওই এলাকার কৃষক সামসুল বেপারী বলেন, খালটি খনন করা হলে আশেপাশের ইরি ব্লকে পানি দেয়াসহ পাট জাগ দিতে সুবিধা হবে। কৃষকরা কম খরচে নৌ পথে তাদের ফসল আনা নেয়া করতে পারবে।

স্থানীয় মৌলভীর চরের বাসিন্দা মো. হারুন মুন্সি (৬৫) বলেন, ছোটবেলায় এই খালে লঞ্চ চলতো। আমরা এই পথেই যাতায়াত করতাম। খালটি খনন করা হলে এলাকাবাসী কৃষি কাজসহ নানা দিক দিয়েই উপকৃত হবেন। খাল খননের এই কাজটি যেন বন্ধ হয়ে না যায় সেজন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, সরকারি কাজে কেউ বাধা দিতে পারে না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ তুলতে পারে। তিনি বলেন, হাইকোর্ট তো খাল খননে স্থাগিতাদেশ দেয়নি, তবে কেন কাজ বন্ধ হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।